স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পৃথক লড়াইয়ের প্রস্তুতি জামায়াত-এনসিপির

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৬ বিকাল
  • ৮৮৩০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। ১১ দলীয় ঐক্যে থাকলেও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটের বাইরে গিয়ে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দল দুটি। ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পৃথক প্রার্থীর নামও চূড়ান্ত করেছে তারা। এতে জোটের অভ্যন্তরে দূরত্ব ও আস্থার সংকট নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হলেও দুই দলের নেতারা বলছেন, এটি জোট ভাঙনের লক্ষণ নয়; বরং নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার কৌশল।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী সম্ভাব্য একক প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে এবং তাঁদের নির্বাচনি প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একইভাবে এনসিপিও নিজস্ব প্রার্থী চূড়ান্ত করে নির্বাচনি কার্যক্রম জোরদার করছে। ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের অভিন্ন প্রার্থী দেওয়ার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ হয়ে এসেছে।

ঐক্যে ফাটল নয়, কৌশলগত অবস্থান

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ছাড়াও সাম্প্রতিক কয়েকটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দুই দলের নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শনিবারের জোটের লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে জোটের অভ্যন্তরে দূরত্বের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়।

তবে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন যুগান্তরকে বলেছেন, ১১ দলীয় ঐক্য কিংবা জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির কোনো ধরনের ফাটল বা দূরত্ব নেই। তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কৌশলের কারণে দুই দলের অবস্থানে কিছু পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা বাস্তবায়ন, ফ্যাসিবাদের বিলোপ, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা, গণহত্যার বিচার এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো বৃহত্তর দাবিতে দুই দলের ঐক্য অটুট রয়েছে। তবে দল হিসেবে এনসিপির নিজস্ব পরিকল্পনা ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

আখতার হোসেনের দাবি, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপি নিজেদের কৌশল অনুযায়ী অংশ নেবে, একইভাবে জামায়াতও তাদের আদর্শ ও সাংগঠনিক পরিকল্পনা অনুসরণ করবে। পৃথকভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতিকে জোটের ভাঙন হিসেবে দেখানো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

জামায়াতও দেখছে না দূরত্ব

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও দুই দলের মধ্যে দূরত্বের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম একটি লংমার্চে অংশ নিতে পারেননি। অসুস্থতা বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে কোনো নেতা কর্মসূচিতে অনুপস্থিত থাকতেই পারেন। এ নিয়ে জোটের মধ্যে ফাটল খোঁজার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, সংসদ ও সংসদের বাইরে দুই দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিতেও জোটের কোনো সমস্যা দেখছেন না তিনি। তবে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করার সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

ঢাকার দুই সিটিতে পৃথক প্রার্থী

জামায়াত ও এনসিপির পৃথক নির্বাচনি প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। দুই দলই ইতোমধ্যে আলাদা প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে।

জামায়াত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিনকে এবং দক্ষিণে ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করেছে।

অন্যদিকে এনসিপি ঢাকা উত্তরে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর আগে দলটি উত্তরে আরিফুল ইসলামের নামও সামনে এনেছিল। পরে আসিফ মাহমুদ ঢাকা উত্তরের ভোটার হন এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী দক্ষিণের ভোটার হন।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বুধবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যুগান্তরকে বলেন, দলের মধ্যে ভিন্নমত ও মতপার্থক্য থাকাটা স্বাভাবিক। কেউ জোটগত নির্বাচনের পক্ষে, আবার কেউ এককভাবে নির্বাচনের পক্ষে মত দিতে পারেন। তবে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এনসিপি আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।

জোটের ভেতরে আস্থার সংকটের আলোচনা

রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এনসিপি সম্প্রতি সাংগঠনিক পুনর্গঠন, কমিটি পরিবর্তন এবং নিষ্ক্রিয় নেতাদের পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি জোটের বাইরে গিয়ে নিজস্ব সভা-সমাবেশ ও নির্বাচনি প্রস্তুতি চালাচ্ছে দলটি। এতে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা স্পষ্ট হচ্ছে।

তবে ১১ দলীয় ঐক্যের কয়েকজন নেতার মতে, জোটের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের অনুপস্থিতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য ও আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জোটের একটি অংশ মনে করে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে জনপ্রিয় প্রার্থীকে অভিন্নভাবে মনোনয়ন দেওয়া হলে জয়ের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এ কারণে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার ভিত্তিতে জোটগত নির্বাচনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না কেউ কেউ।

সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও এনসিপি পৃথক রাজনৈতিক ও নির্বাচনি কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। তবে নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলন ও অভিন্ন দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্য বজায় রাখার অবস্থানেই রয়েছে দল দুটি। এখন নির্বাচনের মাঠে এই পৃথক অবস্থান কতটা কার্যকর হয় এবং শেষ পর্যন্ত জোটগত সমঝোতার কোনো পথ তৈরি হয় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad