সংবাদ প্রচারে ইসলামের কঠোর নির্দেশনা: যাচাই ছাড়া শেয়ার করলেই মিথ্যার দায়

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০২ বিকাল
  • ৭৫৪১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সংবাদ, ছবি, ভিডিও কিংবা কোনো তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে মুহূর্তই যথেষ্ট। ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিদিন অসংখ্য তথ্য প্রচারিত হচ্ছে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে বিশ্বাস ও প্রচারের কারণে বাড়ছে গুজব, অপপ্রচার, ব্যক্তির সম্মানহানি এবং সামাজিক বিভেদ। ইসলামে সংবাদ গ্রহণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই, দায়িত্বশীলতা এবং সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইসলামি বিধান অনুযায়ী, কোনো সংবাদ শোনা বা দেখার পরই তা সত্য বলে বিশ্বাস করা কিংবা অন্যের কাছে প্রচার করা উচিত নয়। বরং সংবাদটির উৎস, নির্ভরযোগ্যতা ও প্রমাণ যাচাই করতে হবে। এমনকি কোনো সংবাদ সত্য হলেও তা প্রচারের ফলে কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মান বা অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে নাও; যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ৬)।

এই আয়াতের মাধ্যমে সংবাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইয়ের মৌলিক নীতি নির্ধারণ করা হয়েছে। সংবাদদাতার পরিচয়, সততা, উদ্দেশ্য এবং তথ্যের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, তা বিবেচনা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। সংবাদটি প্রচারের ফলে কোনো ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান কিংবা সম্প্রদায়ের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করে বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা কিছু শোনে, সবই প্রচার করে বেড়ায়।’ (সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা, হাদিস: ৫)।

হাদিসটির শিক্ষা হলো, কেউ নিজে মিথ্যা সংবাদ তৈরি না করলেও যাচাই ছাড়াই অন্যের কাছ থেকে শোনা কথা প্রচার করলে মিথ্যা ছড়ানোর দায়ে জড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, প্রচারিত কথার মধ্যে ভুল তথ্য, অতিরঞ্জন, অপবাদ কিংবা ভিত্তিহীন অভিযোগ থাকার আশঙ্কা থাকে।

যাচাই ছাড়া সংবাদ প্রচার বিপজ্জনক

ইসলামের দৃষ্টিতে সংবাদ গ্রহণ, বিশ্বাস, প্রচার এবং তার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া পৃথক বিষয়। কোনো ব্যক্তি বা গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদকে যথাযথ প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা দায়িত্বশীল আচরণ নয়। বিশেষ করে কারও চরিত্র, সম্মান, ধর্মীয় অবস্থান কিংবা সামাজিক মর্যাদাসংশ্লিষ্ট তথ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক ধারণা থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো ধারণা পাপ।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১২)।

একইভাবে মিথ্যা বা অপবাদমূলক সংবাদ শেয়ার, লাইক, কমেন্ট কিংবা ফরওয়ার্ডের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়াও অন্যায়ের বিস্তারে সহযোগিতা হতে পারে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা আল-মায়িদা, আয়াত: ২)।

এ ছাড়া কোনো সংবাদ সত্য হলেও তা সব সময় প্রকাশযোগ্য নয়। ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক বিষয়, গোপনীয়তা কিংবা প্রকৃত কোনো দোষ অপ্রয়োজনে প্রকাশ করলে তা গিবত ও সম্মানহানির পর্যায়ে পড়তে পারে। তবে জনস্বার্থ রক্ষা, অন্যায় প্রতিরোধ, বিচারপ্রার্থনা কিংবা মানুষকে ক্ষতি থেকে সতর্ক করার মতো বৈধ কারণ থাকলে প্রয়োজনের সীমায় তথ্য প্রকাশের সুযোগ রয়েছে।

গণমাধ্যমের সংবাদও যাচাই জরুরি

জাতীয় দৈনিক, টেলিভিশন কিংবা জনপ্রিয় অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত হলেই কোনো সংবাদ শতভাগ নির্ভুল—এমন ধারণার সুযোগ নেই। সংবাদদাতার ভুল, সম্পাদনার ত্রুটি, অসম্পূর্ণ তথ্য, একপক্ষীয় বক্তব্য কিংবা রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের কারণে সংবাদ বিভ্রান্তিকর হতে পারে।

তাই সংবাদ প্রচারের আগে এর মূল উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য, নির্ভরযোগ্য দলিল, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিরোনামের সঙ্গে মূল প্রতিবেদনের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, পুরোনো ছবি বা ভিডিও নতুন ঘটনার নামে প্রচার করা হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, অডিও, ভিডিও এবং ডিপফেক তৈরি করা হচ্ছে। ফলে শুধু চোখে দেখা কিংবা কানে শোনাকে কোনো তথ্যের সত্যতার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা নিরাপদ নয়।

গুজবের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষতি

যাচাইবিহীন সংবাদ প্রচারের প্রভাব ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ফলে ব্যক্তির সম্মানহানি, পারিবারিক কলহ, সামাজিক সম্পর্কের অবনতি, ধর্মীয় বিভ্রান্তি এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। রাজনৈতিক অপপ্রচার জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। একইভাবে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়লে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাও থাকে।

এ ছাড়া বিচার হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে জনমত তৈরি করা ন্যায়বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। আবেগ, দলীয় পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে সংবাদ গ্রহণের প্রবণতা বাড়লে সমাজে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যও ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের করণীয়

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মতো মাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রত্যেকেরই তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্ব রয়েছে। কোনো সংবাদ, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার আগে এর উৎস ও সত্যতা যাচাই করতে হবে। শুধু শিরোনাম দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পুরো প্রতিবেদন পড়তে হবে এবং ঘটনার সময়, স্থান ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে।

ধর্মীয় অনুভূতি, রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত আবেগের সঙ্গে কোনো তথ্য মিলে গেলেই সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে উসকানিমূলক পোস্ট, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো তথ্য এবং অন্যের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করে এমন বিষয় প্রচার থেকে বিরত থাকতে হবে।

কোনো ভুল সংবাদ শেয়ার করার পর সেটি মিথ্যা প্রমাণিত হলে সংশোধন বা প্রত্যাহার করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে দুঃখ প্রকাশ করাও দায়িত্বশীলতার অংশ। অন্যের পোস্ট শেয়ার করলেও প্রচারের দায় থেকে মুক্ত থাকা যায় না।

সংবাদ প্রচারের আগে পাঁচটি প্রশ্ন

কোনো সংবাদ শেয়ার করার আগে নিজেকে পাঁচটি প্রশ্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংবাদটি সত্য ও নির্ভরযোগ্য কি না, এর মূল উৎস বিশ্বস্ত কি না, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট জানা আছে কি না, প্রচারের ফলে কারও সম্মান বা নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না এবং আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হলে তথ্যটির পক্ষে প্রমাণ দেওয়া সম্ভব হবে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।

প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না পাওয়া গেলে সংবাদটি প্রচার না করাই নিরাপদ।

সত্য প্রকাশ ও জনস্বার্থ রক্ষাও ইসলামের শিক্ষা

সংবাদ যাচাইয়ের অর্থ সব সংবাদ অবিশ্বাস করা কিংবা অন্যায়-দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত থাকা নয়। বরং ইসলামের শিক্ষা হলো, সত্যকে গ্রহণ করা, মিথ্যাকে প্রত্যাখ্যান করা এবং প্রমাণিত অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগতভাবে কথা বলা।

দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি, মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় সতর্কবার্তা দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের প্রমাণিত অনিয়ম তুলে ধরা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রেও তথ্যের সত্যতা, উদ্দেশ্যের শুদ্ধতা, ভাষার সংযম এবং ব্যক্তি-অধিকারের প্রতি সম্মান বজায় রাখা প্রয়োজন।

আখিরাতেও রয়েছে জবাবদিহি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করা প্রতিটি পোস্ট, মন্তব্য ও শেয়ারের জন্যও জবাবদিহির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ইসলাম। কোনো সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে কারও সম্মানহানি, অপবাদ কিংবা সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি হলে শুধু ‘আমি অন্যের পোস্ট শেয়ার করেছি’—এ অজুহাতে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর—এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬)।

অতএব, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে একজন মুসলমানের দায়িত্ব শুধু সংবাদ গ্রহণ বা প্রচার করা নয়; বরং সত্যতা যাচাই করে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া। একটি শেয়ার যেমন মানুষের উপকার করতে পারে, তেমনি তা কারও সম্মানহানি, পারিবারিক বিপর্যয় কিংবা সামাজিক অস্থিরতার কারণও হতে পারে। তাই সংবাদ বিশ্বাসের আগে যাচাই এবং প্রচারের আগে এর পরিণতি বিবেচনা করাই ইসলামের নির্দেশিত নীতি।

তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন—সুরা আল-হুজুরাত (আয়াত ৬ ও ১২), সুরা আন-নূর (আয়াত ১৫), সুরা আল-মায়িদা (আয়াত ২), সুরা আল-ইসরা (আয়াত ৩৬); সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা, হাদিস ৫।

মূল লেখক: মুফতি শরীফ মালিক, সিনিয়র মুফতি ও শিক্ষাসচিব, শাইখ যাকারিয়া ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা।

মূল প্রকাশনা: আমার দেশ, ৬ নভেম্বর ২০২৬।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad