ভারতের পেট্রলে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি ইথানল মেশানোর অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ‘জ্বালানি চুরি’র সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর দাবি, ই২০ পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল থাকার কথা থাকলেও কর্ণাটকের সাত জেলা থেকে সংগ্রহ করা নমুনার পরীক্ষায় নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি ইথানল পাওয়া গেছে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ই২০ হয়ে গেছে ৪২০—জনগণের গাড়ি থেকে পেট্রল চুরি!’ ভারতের প্রচলিত দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা প্রতারণার অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ শব্দ ব্যবহার করে মোদি সরকারের জ্বালানিনীতি নিয়ে ব্যঙ্গ করেন তিনি।
রাহুল গান্ধী জানান, কর্ণাটক সরকারের উদ্যোগে সাত জেলা থেকে সংগ্রহ করা পেট্রলের ১৪টি নমুনা স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টিতে ২০ শতাংশের বেশি ইথানল পাওয়া গেছে। পরীক্ষার ফল অনুযায়ী, ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের (আইওসিএল) একটি নমুনায় ৩১ দশমিক ২ শতাংশ এবং হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (এইচপিসিএল) নমুনায় ৩০ দশমিক ৫ শতাংশ ইথানল পাওয়া গেছে বলে দাবি তাঁর।
রাহুল গান্ধী বলেন, অতিরিক্ত ইথানল মেশানোর কারণে গাড়ির কার্যক্ষমতা কমতে পারে, জ্বালানির মাইলেজ হ্রাস পেতে পারে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। পেট্রল পাম্পে জ্বালানিতে প্রকৃতপক্ষে কত শতাংশ ইথানল রয়েছে, তা উল্লেখ করে লেবেল না থাকার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মোদি সরকারকে প্রকাশ্য বিতর্কে বসার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে রাহুল বলেন, ইথানল মেশানোর বিষয়টিও আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাঁর প্রশ্ন, দেশের গাড়ির ট্যাংকে কী ধরনের জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে এবং নির্ধারিত সীমার বেশি ইথানল মেশানোর অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কখন ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
কর্ণাটক সরকারের অভিযোগরাহুল গান্ধীর বক্তব্যের এক দিন আগে কর্ণাটক সরকার বড় তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি ইথানল মেশানো পেট্রল সরবরাহের অভিযোগ তোলে।
রাজ্যের খাদ্য, সরবরাহ, ভোক্তাবিষয়ক ও আইন পরিমাপবিষয়ক মন্ত্রী রিজওয়ান আরশাদ জানান, বেঙ্গালুরু, কোলার, চিক্কাবল্লাপুর, বেঙ্গালুরু গ্রামীণ, রামনগর, মাঙ্গালুরু ও তুমাকুরু জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বেঙ্গালুরুর শ্রী রাম রিসার্চ ইনস্টিটিউটে পরীক্ষার পর এসব নমুনায় নির্ধারিত মাত্রার বেশি ইথানল পাওয়ার তথ্য সামনে আসে।
রাজ্য সরকারের দাবি, ১৪টি নমুনার মধ্যে ১১টিতে ইথানলের পরিমাণ ২০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। সর্বোচ্চ ৩১ দশমিক ২ শতাংশ ইথানল পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট তেল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে রাজ্য সরকার।
অভিযোগ অস্বীকার তেল কোম্পানিগুলোরতবে কর্ণাটক সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান আইওসিএল, ভারত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসিএল) ও এইচপিসিএল। কোম্পানিগুলো নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
যৌথ বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো জানায়, তাদের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করা ই২০ পেট্রল ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডসের নির্ধারিত আইএস ১৭০২১ মানদণ্ড অনুসরণ করে। এ মানদণ্ড অনুযায়ী, জ্বালানিতে ইথানলের পরিমাণ ১৯ থেকে ২১ শতাংশের মধ্যে থাকার কথা।
কোম্পানিগুলোর দাবি, কর্ণাটক সরকারের প্রকাশ করা পরীক্ষার ফল আইনগত ও কারিগরি পদ্ধতি অনুসরণ করে পরিচালিত পরীক্ষার মাধ্যমে সমর্থিত নয়। তৃতীয় পক্ষের পরীক্ষাগারের সনদেও পরীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই বলে অভিযোগ করেছে তারা। ফলে পরীক্ষার ফল স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয় বলে তাদের বক্তব্য।
ই২০ পেট্রল নিয়ে উদ্বেগই২০ পেট্রল হলো ২০ শতাংশ ইথানল ও ৮০ শতাংশ পেট্রলের মিশ্রণ। ইথানল মূলত আখসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য থেকে উৎপাদিত হয়। অপরিশোধিত তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয় ভারতকে। এ নির্ভরতা কমাতে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে জৈব জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
গত এক দশকে মোদি সরকার এ কর্মসূচি জোরদার করেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ভারতে পেট্রলে ইথানল মেশানোর হার দেড় শতাংশেরও কম ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ২০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
তবে ই২০ পেট্রল ব্যবহারে গাড়ির ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে চালকদের মধ্যে। বিশেষ করে কম ইথানলযুক্ত জ্বালানির জন্য তৈরি পুরোনো গাড়ির ইঞ্জিনে এ মিশ্রণ ক্ষতিকর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এতে মাইলেজ কমার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়তে পারে।
ভারত সরকারও এর আগে স্বীকার করেছে, ই২০ পেট্রল ব্যবহারে জ্বালানির দক্ষতা ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে ইথানলের কারণে গাড়ির ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ নাকচ করেছে সরকার।
অন্যদিকে তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর উদ্ধৃত পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ইথানল মিশ্রণ কর্মসূচির মাধ্যমে ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি রুপির বেশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে। এ সময়ে প্রায় ৩১৬ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেলের বিকল্প তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ প্রায় ৯৫২ লাখ মেট্রিক টন কমেছে এবং কৃষকদের ১ লাখ ৬৬ হাজার কোটি রুপির বেশি অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক