বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট বা ছাড় দিচ্ছে সরকার। বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব রাখা, প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করা এবং খরচ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকায় এ ব্যবস্থা গ্রাহকদের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে। একই সঙ্গে অগ্রিম রাজস্ব আদায়, বকেয়া বিলের জটিলতা কমানো ও বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারে গ্রাহক যেকোনো সময় নিজের অবশিষ্ট ব্যালেন্স ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ জানতে পারেন। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব। বিপরীতে, পোস্টপেইড মিটারে সাধারণত মাস শেষে বিলের পরিমাণ জানা যায়। এতে আগে থেকে ব্যয়ের হিসাব রাখা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।
রিচার্জের অর্থে যেভাবে ছাড়প্রিপেইড মিটারে প্রতি মাসের প্রথম রিচার্জের সময় প্রযোজ্য ডিমান্ড চার্জ, ভ্যাট ও মিটার ভাড়া সমন্বয় করা হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট যোগ হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগের দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, ২ কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের একজন আবাসিক গ্রাহক প্রথমবার ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া বাবদ ১৭১ টাকা ৬২ পয়সা কাটা হবে। এরপর রিবেট যোগ হয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে জমা থাকবে ৮৩২ টাকা ৫২ পয়সা।
প্রিপেইড সংযোগ নিতে কোনো নিরাপত্তা জামানত দিতে হয় না। তবে আবাসিক গ্রাহকের অনুমোদিত লোডের প্রতি কিলোওয়াটের জন্য মাসে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার সরবরাহ করা সিঙ্গেল ফেজ মিটারের মাসিক ভাড়া ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারের ভাড়া ২৫০ টাকা।
কোনো মাসে রিচার্জ না করলেও আগের ব্যালেন্স অবশিষ্ট থাকলে তা দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। তবে ওই মাসের প্রযোজ্য ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া পরবর্তী রিচার্জের সময় সমন্বয় করা হয়।
মোবাইল ব্যাংকিংয়েও রিচার্জপ্রিপেইড মিটারে মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যেকোনো সময় রিচার্জ করা যায়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ভেন্ডিং স্টেশন, পিওএস এজেন্ট ও ব্যাংকের বুথ থেকেও রিচার্জের সুযোগ রয়েছে।
মিটারের ব্যালেন্স কমে এলে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়। নির্ধারিত ‘ফ্রেন্ডলি আওয়ারে’ ব্যালেন্স শেষ হলেও জরুরি ক্রেডিট সুবিধার মাধ্যমে সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার চালু রাখা সম্ভব।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রিপেইড মিটারে বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার রিডিং নেওয়া, বিল তৈরি ও বিতরণের প্রয়োজন কমে। এতে জনবল ও যাতায়াত ব্যয় সাশ্রয় হয়। পাশাপাশি অগ্রিম অর্থ আদায় সহজ হওয়ায় বিতরণ সংস্থাগুলোর বকেয়া বিলসংক্রান্ত জটিলতাও কমে।
গ্রাহক বাড়ছে বিতরণ সংস্থাগুলোতেবিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) প্রায় ২০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ১২ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (নেসকো) ২৩ লাখের বেশি গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ এ ব্যবস্থার আওতায় এসেছেন।
ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) ১৪ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ জন গ্রাহকের মধ্যে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮১ জন প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৪ জন গ্রাহকের মধ্যে প্রিপেইড মিটার রয়েছে ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৭ জনের।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীন প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছেন।
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে দেশের সব গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে। এ কার্যক্রম অনেকাংশে বাস্তবায়িত হয়েছে। নেসকোর ৬০ শতাংশের বেশি গ্রাহকের প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ ও সমস্যা কমাতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি জানান, ডেসকোর অ্যাপের মাধ্যমে মিটারের অবশিষ্ট ব্যালেন্স ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য জানা যায়। এসব সুবিধা সম্পর্কে গ্রাহকদের ধারণা বাড়লে বিল নিয়ে উদ্বেগ কমতে পারে। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও গণমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) নূর আহমদ বলেন, প্রিপেইড মিটারে রিবেটসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে, যা গ্রাহকের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে সহায়তা করতে পারে। ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার অপরিহার্য বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রিপেইড মিটারসংক্রান্ত তথ্য বা অভিযোগ জানাতে বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় হটলাইন ১৬৯৯৯ চালু রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব হটলাইনেও যোগাযোগ করা যায়।
তথ্যসূত্র: বিদ্যুৎ বিভাগ, বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য।

প্রথম দর্পণ,জাতীয় ডেস্ক