হাসিনার স্বপ্ন ভেঙে দিল জাতিসংঘ!

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৯ জুন ২০২৬, ০৬:০২ বিকাল
  • ৭৩০০ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা কেবল একটি দল বা একজন নেতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না; বরং একটি জাতির রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাষ্ট্রের গতিপথ এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকেও নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ছিল তেমনই একটি ঘটনা। সেই অভ্যুত্থানের অভিঘাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—তিনি কি আবার ফিরে আসবেন? আওয়ামী লীগ কি আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে পারবে?


বিশেষ করে গত কয়েক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি আবহ তৈরি করার চেষ্টা চলছিল যেন শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন শুধু সময়ের ব্যাপার। অসংখ্য ইউটিউব চ্যানেল, ফেসবুক পেজ, রাজনৈতিক প্রচারক এবং কিছু কথিত সাংবাদিক প্রতিদিন নতুন নতুন গল্প পরিবেশন করছিলেন। কোথাও বলা হচ্ছিল আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হচ্ছে, কোথাও বলা হচ্ছিল জাতিসংঘ তদন্তে বড় ধরনের অসঙ্গতি পেয়েছে, আবার কোথাও দাবি করা হচ্ছিল শেখ হাসিনা খুব দ্রুত বাংলাদেশে ফিরে আসবেন এবং পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবেন।


কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব কল্পকাহিনী বাস্তবতার কাছে অসহায় ভাবে আত্মসমর্পণ করেছে।


সম্প্রতি জাতিসংঘের সদর দপ্তরে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা কার্যত শেখ হাসিনা এবং তাঁর সমর্থকদের দীর্ঘদিনের প্রচারণার ভিত্তিকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করেনি বরং ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্নের ফানুসকে সম্পূর্ণরূপে ফুটো করে দিয়েছে।


২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতি পূর্ণ আস্থা পুনর্ব্যক্ত করেছে জাতিসংঘ। শুধু তাই নয়, প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করার কোনো ভিত্তি নেই বলেও স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে।

এটি নিছক একটি কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট বার্তা।


উল্লেখ্য, জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে মানবাধিকার দপ্তর এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। কিন্তু এই প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য, বিশেষ করে নিহতের সংখ্যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী তিনি জাতিসংঘকে চিঠিও দিয়েছিলেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, হয়তো আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে কিংবা অন্তত তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।


কিন্তু ঘটেছে ঠিক উল্টোটা।


জাতিসংঘের অবস্থান পরিষ্কার—তারা তাদের প্রতিবেদনের পক্ষে আছে এবং সেই প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করার কোনো কারণ খুঁজে পায়নি।


ফলে গত কয়েক মাস ধরে যে রাজনৈতিক বর্ণনা তৈরি করা হচ্ছিল, সেটি কার্যত ভেঙে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল যেন শেখ হাসিনাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এবং তাঁর প্রত্যাবর্তন অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি আবেগ দিয়ে পরিচালিত হয় না; পরিচালিত হয় তথ্য, বাস্তবতা ও স্বার্থের ভিত্তিতে। একথা আমি আগেও বহুবার বলেছি।


বাংলাদেশের মানুষের একটি বড় দুর্বলতা হলো আমরা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। খুব দ্রুত আশা করি, আবার খুব দ্রুত হতাশও হয়ে পড়ি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, রাজনৈতিক প্রচারণা কিংবা ইউটিউবভিত্তিক অপপ্রচার অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। ফলে একটি কল্পিত প্রত্যাবর্তনের গল্পও অনেকের কাছে বাস্তব বলে মনে হতে থাকে।


কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কিংবা আন্তর্জাতিক কূটনীতি ইউটিউবের শিরোনাম দিয়ে চলে না।


অনেকেই ভুলে যান যে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে যে ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার প্রভাব কেবল রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রের প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন ব্যবস্থা, ব্যাংকিং খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা—সবখানেই মারাত্মক ক্ষত তৈরি হয়েছে। ব্যাংক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ, আর্থিক শৃঙ্খলার অবনতি, ঋণখেলাপির সংস্কৃতি, দুর্নীতি এবং জবাবদিহিতার সংকট রাষ্ট্রযন্ত্রকে দুর্বল করে তুলেছিল।


এখানে মনে রাখো অত্যন্ত জরুরী যে,একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করা যত সহজ, সেটিকে পুনর্গঠন করা তত সহজ নয়।


সেই কারণেই আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতাকে বুঝতে হলে আবেগ নয়, ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান কখনো কয়েক মাসে হয় না। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল এবং পরবর্তীতে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের প্রথম কয়েক মাসকে কেন্দ্র করে যারা তাৎক্ষণিক অলৌকিক পরিবর্তন প্রত্যাশা করছেন, তারা সম্ভবত রাষ্ট্র পুনর্গঠনের জটিলতা পুরোপুরি উপলব্ধি করছেন না।


যে অর্থনীতি বছরের পর বছর অনিয়মের বোঝা বহন করেছে, যে প্রশাসন রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আস্থা হারিয়েছে—সেগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে সময় লাগবে। শুধু সময় নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ধারাবাহিক সংস্কার এবং জাতীয় ঐকমত্য।


আমার ব্যক্তিগত মূল্যায়ন হলো, শেখ হাসিনা সরকারের রেখে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষত সারিয়ে বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কমপক্ষে এক দশক সময় লাগতে পারে। এটি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং উন্নয়ন অর্থনীতির বাস্তব অভিজ্ঞতা।


বিশ্বের বহু দেশেই দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ধরে দুর্বল হয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনে একাধিক সরকারকে কাজ করতে হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ কিংবা লাতিন আমেরিকার অনেক রাষ্ট্র তার উদাহরণ।


এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধৈর্য। যদি নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক শক্তি এবং সাধারণ মানুষ মাত্র ১৮ বা ২০ মাসের মাথায় হতাশ হয়ে পড়েন, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ মাঝপথে থেমে গেলে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা প্রায়শই নতুন সংকটের জন্ম দেয়।


আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। আজকের বাংলাদেশ এমন একটি সরকার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং গণতান্ত্রিক বৈধতার ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করছে।


এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক অবস্থান কেবল জুলাই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদনকে সমর্থন করেনি; বরং এটি একটি বার্তাও দিয়েছে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।


একই ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জাতিসংঘের মুখপাত্র যে মন্তব্য করেছেন, সেটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেছেন, অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার হওয়া উন্নয়নের পথে বড় বাধা এবং জনগণের অর্থ জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এই বক্তব্যও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অতীত আর্থিক অনিয়মের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে।


সুতরাং আজকের বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ একটি কঠিন কিন্তু সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পথ নিঃসন্দেহে দীর্ঘ, জটিল এবং চ্যালেঞ্জপূর্ণ। কিন্তু জাতিসংঘের সাম্প্রতিক অবস্থান অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে যে রাজনৈতিক স্বপ্ন বা প্রচারণা তৈরি করা হচ্ছিল, তার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।


ইতিহাসের নির্মম সত্য হলো, ক্ষমতা হারানো অনেক নেতা ফিরে আসার স্বপ্ন দেখেন; কিন্তু সব স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয় না। বিশেষ করে যখন সেই স্বপ্নের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, আন্তর্জাতিক তদন্তের তথ্য এবং একটি জাতির নতুন করে পথচলার আকাঙ্ক্ষা। সুতরাং মাথা উঁচু করে ফেরার যে স্বপ্ন শেখ হাসিনা দেখেছিলেন। তাতে জল ঢেলে দিয়েছে জাতিসংঘ।


পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রত্যাবর্তন নয়; বরং একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠন। সেই লক্ষ্য অর্জনে আবেগ নয়, প্রয়োজন ধৈর্য, বাস্তবতা উপলব্ধি করার সক্ষমতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ও পূর্ণ আস্থা। কারণ রাষ্ট্র গঠনের লড়াই কখনো কয়েক মাসের হয় না; বরং এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা এক দীর্ঘ অভিযাত্রা। সুতরাং এই অভিযাত্রায় আমাদের জিততেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

ই-মেইল: ahabibhme@gmail.com





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad