সিরাজগঞ্জ শহরের ফুটপাত এখন যেন খাবার প্রেমীদের মিলনস্থল। সন্ধ্যা নামলেই শহরের বিভিন্ন মোড়ে, বিশেষ করে এস এস রোড ও মুজিব সড়কে জমে ওঠে ভ্রাম্যমান খাবারের দোকানগুলোর ভিড়। ধোঁয়া ওঠা ভাজাপোড়া, মসলার ঘ্রাণ আর তরুণদের আনাগোনায় শহরের প্রধান সড়কগুলো রূপ নেয় এক ব্যস্ত ফুড করিডোরে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ‘আহার অঙ্গন’ নামের একটি দোকানকে ঘিরে। এসএস রোডের ফুটপাতের উপর স্থাপিত, এই ভ্রাম্যমান খাবারের দোকানটি পরিচালনা করছেন একজন তরুণী। ইতিমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন এই তরুণী। ভিডিও ও ছবিতে তার হাসিমুখে গ্রাহক সেবার দৃশ্য জনপ্রিয়তা পেয়েছে, ফলে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই দোকানটির সামনে ভিড় করছেন শত শত মানুষ। কেউ আসছেন খাবার কিনতে, কেউ শুধু কৌতূহলবশত দেখতে।
তবে এই জনপ্রিয়তাই এখন শহরবাসীর জন্য ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, আহার অঙ্গনের সামনে ক্রেতাদের ভিড় এতটাই বেড়েছে যে, ফুটপাত দিয়ে হাঁটার জায়গা পর্যন্ত থাকে না। কেউ দাঁড়িয়ে খাচ্ছেন, কেউ বসে খাচ্ছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ রাস্তার পাশে থেমে কৌতূহল দেখছেন— ফলে যানজটও সৃষ্টি হচ্ছে এই রোডে।
এস এস রোডের পাশাপাশি শহরের মুজিব সড়কের, বিশেষ করে চৌরাস্তা থেকে রেজিস্ট্রার অফিস এলাকা পর্যন্ত এখন একই চিত্র— ফুটপাত জুড়ে দোকান, সামনে-পিছে দাঁড়িয়ে খাবার খাচ্ছেন ক্রেতারা।
অনেকে অভিযোগ করেন, এখন ফুটপাত দিয়ে হাঁটার জায়গা নেই। ফুটপাত এখন খাওয়ার বৈঠকখানা। সন্ধার পর থেকেই ক্রেতাদের ভিড়ে পুরো পথ দখল হয়ে থাকে। এদিকে, ফুটপাতে বসানো এসব ভ্রাম্যমান খাবারের দোকানের কারণে যারা বৈধভাবে দোকান ভাড়া নিয়ে রেস্টুরেন্ট বা খাবারের হোটেল চালাচ্ছেন, তাদেরও ক্রেতা কমে যাচ্ছে। ভাড়াসহ প্রতিদিনের খরচ সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন বৈধ হোটেল ব্যবসায়ীরা।
ভ্রম্যমান দোকান সম্পর্কে কথা হয় একজন বৈধ রেস্টুরেন্টে মালিকের সাথে, তিনি বলেন, আমরা নিয়ম মেনে দোকান চালাই, ভাড়া দেয়, গ্যাস–বিদ্যুৎ, কর্মচারীর বেতন খরচ করি, কিন্তু ফুটপাতে বসা দোকানগুলোতে নেই কোন নিয়ম, দিতে হয়না ভাড়া, ফলে তাদের খরচ কম। আর ক্রেতারা বেশি ভিড়ের জায়গায় সময় কাটাচ্ছে। এতে আমাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এটা শহরের জন্যও ভালো নয়।
অন্যদিকে কথা হয় একজন হোটেল মালিকের সাথে, তিনি বলেন, ফুটপাতের দোকানগুলো কখনো প্রশাসনের তদারকির শিকার হয় না, কিন্তু আমরা নিয়ম মেনে চলার কারণে নানা নিয়মকানুন মেনে চলতে বাধ্য। এতে ক্রেতা কমে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়িক চাপ বাড়ছে।
এদিকে, শহরের ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো বন্ধে পৌর কর্তৃপক্ষ মাঝেমধ্যেই উচ্ছেদ অভিযান চালায়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে। বিক্রেতারা জানান, অভিযান হলে তাঁরা সাময়িকভাবে দোকান সরিয়ে ফেলেন, পরে আবার ফিরে আসেন।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, সিরাজগঞ্জ শহরের রাস্তার পাশে দিয়ে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা সরিয়ে নিতে আমাদের পৌর সভার পক্ষ থেকে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। তার পরেও যদি কেও ফুটপাত দখল করে থাকেন, আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
শহরবাসীর প্রশ্ন— শহরের পথচারীরা কবে আবার ফুটপাত ফিরে পাবেন, নাকি ‘আহার অঙ্গন’-এর মতো ভাইরাল দোকানগুলোই হয়ে উঠবে সিরাজগঞ্জের নতুন শহরের বাস্তবতা?

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ