সম্পত্তি দান ও হেবা: রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম ও বাতিলের আইনি বিধান

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
নিজের সম্পত্তি সন্তান, স্বামী-স্ত্রী কিংবা নিকটাত্মীয়ের নামে হস্তান্তর করতে দান বা হেবা দলিল করেন অনেকে। তবে শুধু দলিল নিবন্ধন করলেই হেবা সম্পন্ন হয় না; ঘোষণা, গ্রহণ ও দখল হস্তান্তরের শর্তও পূরণ করতে হয়। ২০২৬ সালের আইনি সংশোধনে নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণের নতুন সুযোগ যুক্ত হয়েছে।

নিজের মালিকানাধীন জমি, বাড়ি কিংবা অন্য সম্পত্তি বিনা মূল্যে অন্যের নামে হস্তান্তরের প্রচলিত পদ্ধতি হলো দান বা হেবা। তবে এ ক্ষেত্রে দলিল নিবন্ধন, সম্পত্তির মালিকানা এবং দখল হস্তান্তরের আইনি শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করলে ভবিষ্যতে মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে সম্পত্তি দানের সাধারণ বিধান রয়েছে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ও ১২৩ ধারায়। মুসলিম ব্যক্তিগত আইনেও হেবা স্বীকৃত। স্থাবর সম্পত্তির দান ও হেবা ঘোষণার ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক।

দান ও হেবা কী, পার্থক্য কোথায়

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছায় ও বিনিময়মূল্য ছাড়া নিজের বিদ্যমান সম্পত্তি অন্য কাউকে হস্তান্তর করলে এবং গ্রহীতা তা গ্রহণ করলে সেটি দান হিসেবে বিবেচিত হয়। যিনি সম্পত্তি দেন, তিনি দাতা; আর যিনি গ্রহণ করেন, তিনি দানগ্রহীতা।

দান বৈধ হওয়ার জন্য দাতাকে সম্পত্তির বৈধ মালিক এবং দান করার আইনগত সক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। একই সঙ্গে দানটি হতে হবে স্বেচ্ছায় এবং বিনা প্রতিদানে। দানগ্রহীতা বা তাঁর পক্ষে বৈধ প্রতিনিধি দাতার জীবদ্দশায় এবং দাতা দান করার সক্ষমতা থাকা অবস্থায় তা গ্রহণ করবেন।

অন্যদিকে, হেবা হলো মুসলিম ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী সম্পত্তি দানের একটি পদ্ধতি। হেবা বৈধ হওয়ার জন্য তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—দাতার স্পষ্ট ঘোষণা, গ্রহীতার গ্রহণ এবং সম্পত্তির বাস্তব বা আইনস্বীকৃত দখল হস্তান্তর।

স্থাবর সম্পত্তির দলিল নিবন্ধন বাধ্যতামূলক

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৩ ধারা অনুযায়ী, জমি বা বাড়ির মতো স্থাবর সম্পত্তি দান করতে নিবন্ধিত দলিল করতে হয়। দলিলে দাতার স্বাক্ষর থাকতে হবে এবং অন্তত দুইজন সাক্ষীর মাধ্যমে তা সত্যায়িত হতে হবে।

মুসলিম আইনের হেবা ঘোষণার ক্ষেত্রেও নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ১৭ ধারায় এ বিধান রয়েছে।

তবে শুধু নিবন্ধিত দলিল থাকলেই হেবা সম্পূর্ণ হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না। ঘোষণা ও গ্রহণের পাশাপাশি দখল হস্তান্তরের বিষয়টিও প্রমাণযোগ্য হতে হবে। ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর দেওয়া এক রায়ে হাইকোর্ট বিভাগও হেবা বৈধতার ক্ষেত্রে এসব শর্তের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নিবন্ধিত হেবা দলিল নিজে থেকেই দখল হস্তান্তরের প্রমাণ নয়।

পুরো সম্পত্তি দান করা যাবে কি

জীবদ্দশায় নিজের বৈধ মালিকানাধীন সম্পত্তি দান বা হেবা করার ক্ষেত্রে সাধারণভাবে এক-তৃতীয়াংশের কোনো সীমা নেই। তবে দাতা তাঁর বৈধ মালিকানাধীন অংশের বেশি সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবেন না।

মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে ওসিয়তের ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশসংক্রান্ত বিধান রয়েছে। কিন্তু জীবদ্দশায় সম্পন্ন দান বা হেবার নিয়ম ওসিয়ত থেকে আলাদা। তবে প্রতারণা, জালিয়াতি, জবরদস্তি বা অযাচিত প্রভাবের মাধ্যমে দলিল করা হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

নিকটাত্মীয়ের মধ্যে হেবা নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা

নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৭৮ক ধারা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়ের মধ্যে হেবা ঘোষণার নিবন্ধন ফি ১০০ টাকা। এ সুবিধা প্রযোজ্য—

স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে;

বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে;

দাদা-দাদি বা নানা-নানি এবং নাতি-নাতনির মধ্যে;

আপন ভাই ও আপন বোনের মধ্যে।

তালিকার বাইরে অন্য কাউকে হেবা করলে ১০০ টাকার নির্দিষ্ট ফি প্রযোজ্য নয়। সে ক্ষেত্রে প্রচলিত সরকারি ফি ও অন্যান্য খরচ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে জেনে নিতে হবে। সাধারণ দানপত্র ও হেবা ঘোষণার নিবন্ধন ফিও এক নয়।

২০২৬ সালের সংশোধনে নতুন সুযোগ

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করে ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ১২২ক ও ১২২খ ধারা যুক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন ১২২ক ধারায় নির্দিষ্ট সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দানের পরও দাতার জীবদ্দশায় তা ভোগের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ সুবিধা প্রযোজ্য হতে পারে—

বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে;

দাদা-দাদি বা নানা-নানি এবং নাতি-নাতনির মধ্যে;

স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে।

এ ধরনের দানের ক্ষেত্রে স্থাবর সম্পত্তির নিবন্ধিত দলিল করতে হবে এবং দলিলে দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

নতুন বিধান অনুযায়ী, দাতার জীবদ্দশায় দানগ্রহীতার মৃত্যু হলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী তাঁর উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে। তবে দাতার জীবদ্দশায় ভোগের অধিকার বহাল থাকবে।

নতুন বিধানে দান বাতিলের প্রক্রিয়া

সংশোধিত আইনের ১২২খ ধারায় ১২২ক ধারার অধীনে নিবন্ধিত দান সাধারণভাবে বাতিল না করার বিধান রাখা হয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম রয়েছে।

দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের সম্মতিতে প্রকৃত আর্থিক, চিকিৎসা, শিক্ষা, পারিবারিক বা অন্য প্রয়োজন দেখা দিলে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দান পরিবর্তন বা বাতিল করা যেতে পারে।

কোনো পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম কিংবা অন্য কোনো কারণে সম্মতি দিতে না পারলে অপর পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নোটিশ ও প্রয়োজনীয় তদন্তের পর আদালত এ বিষয়ে আদেশ দিতে পারেন।

সাধারণ দান বা হেবা বাতিল করা যায় কখন

দান বা হেবা সম্পন্ন হওয়ার পর দাতা ইচ্ছা করলেই একতরফাভাবে তা বাতিল করতে পারবেন—এমন সাধারণ বিধান নেই।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১২৬ ধারা অনুযায়ী, দাতা ও গ্রহীতা সম্মত হলে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা ঘটার শর্তে দান স্থগিত বা বাতিলের বিধান রাখা যেতে পারে। তবে শর্তটি দাতার নিজের ইচ্ছাধীন হতে পারবে না। শুধু দাতার ইচ্ছায় যেকোনো সময় দান বাতিলের শর্ত আইনসম্মত নয়।

প্রতারণা, জবরদস্তি বা অযাচিত প্রভাবের মতো কারণে দলিল সম্পাদিত হলে তা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়।

মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে হেবা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রেও পৃথক বিধান ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী বা নিকটাত্মীয়ের মধ্যে হেবা, দখল হস্তান্তর এবং দাতা বা গ্রহীতার মৃত্যুর মতো বিষয় প্রত্যাহারের সুযোগকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সব হেবা একই নিয়মে বাতিল করা যায় না।

দান বা হেবা করার আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন

সম্পত্তি হস্তান্তরের আগে দাতার বৈধ মালিকানা নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং যৌথ মালিকানা থাকলে দাতার প্রকৃত অংশ যাচাই করতে হবে। দানগ্রহীতা সম্পত্তি গ্রহণ করছেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

হেবার ক্ষেত্রে দখল হস্তান্তরের প্রমাণ সংরক্ষণ এবং স্থাবর সম্পত্তির দলিল যথাযথভাবে নিবন্ধন করা প্রয়োজন। দলিলে বিশেষ কোনো শর্ত থাকলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

সম্পত্তি দান বা হেবার আগে দলিলের ধরন, পক্ষগুলোর সম্পর্ক ও প্রযোজ্য আইন যাচাই করে নেওয়া উচিত। জটিলতা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এবং সম্পত্তি আইন বিষয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।

তথ্যসূত্র: সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২, ১২৩, ১২৬, ১২২ক ও ১২২খ ধারা; নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ১৭ ও ৭৮ক ধারা; বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ২৩ নভেম্বর ২০২৫-এর রায়।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad