ইরানে নতুন হামলার ইঙ্গিত ট্রাম্পের, সরকার উৎখাতের হুমকি নেতানিয়াহুর

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৫ দুপুর
  • ৬৯৬৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সামরিক অভিযানের আশঙ্কা | পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি তেহরানের | কাতার-পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলছে আলোচনা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে। ইরানে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের সরকার উৎখাতের জন্য ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল নতুন করে হামলা চালালে ভৌগোলিক সীমারেখা না মেনে তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনি।

আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা হতে পারে—এমন আশঙ্কার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি মিত্র দেশকে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, সামরিক অভিযান নিয়ে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। একই সময়ে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে।

শনিবার ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মুজতবা খামেনি বলেন, যেকোনো মাত্রা বা ধরনের হুমকির জবাব তাৎক্ষণিক, কার্যকর এবং ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাহীন হতে হবে। তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত বিবৃতিতে এ হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

বৈঠকে সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি, সেনাপ্রধান আমির হাতামি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) প্রধান আহমদ ওয়াহিদি উপস্থিত ছিলেন। সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এটিই মুজতবা খামেনির প্রথম প্রকাশ্য বৈঠক। গত মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

বৈঠকে সামরিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকা হালনাগাদ করার নির্দেশ দেন মুজতবা খামেনি। এতে ‘আমেরিকান-জায়নবাদী শত্রুর’ দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সব ধরনের সম্পদ অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন তিনি। পারস্য উপসাগরীয় উপকূল, হরমুজ প্রণালি, ওমান উপসাগর এবং সীমান্ত এলাকায় সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতি বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন জানিয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে নতুন হামলার ইঙ্গিত

শনিবার ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ ধ্বংস করেছে। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিও কার্যত ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এক বা দুটি লক্ষ্যবস্তুতে এখনো হামলা চালানো বাকি রয়েছে বলে জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা হয়েছে। এখনো এক বা দুটি স্থাপনার বিষয় বাকি থাকলেও ১০ মিনিটের মধ্যে সেগুলো মোকাবিলা করা সম্ভব।

এ সময় ইরানের সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এর কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে ইরান ওই স্থাপনায় পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করা হবে কি না, সে বিষয়ে সরাসরি ঘোষণা না দিলেও দেশটিকে ‘শেষ করে দেওয়ার’ বিষয়টি বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। শনিবার তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবে এগোচ্ছে, যদিও দেশটির ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখা যায় না।

ইরানের সরকার উৎখাতের কথা বলছেন নেতানিয়াহু

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ২২ অক্টোবর ইসরাইলি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ইরানের বর্তমান সরকার উৎখাতের জন্য ‘ঐতিহাসিক ও একবারই পাওয়া যায় এমন সুযোগ’ তৈরি হয়েছে।

নেতানিয়াহুর অভিযোগ, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি তাঁর বাবার পথ অনুসরণ করে আবারও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছেন। ইরান থেকে হুমকি দূর করতে দেশটির বর্তমান সরকারকে চূড়ান্তভাবে উৎখাত করা ছাড়া বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগে ১৪ অক্টোবর নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরাইলের নির্বাচনের আগে ইরানে আগাম হামলার পক্ষে তিনি নন। তবে ইরান বা দেশটির মিত্ররা ইসরাইলে হামলা চালালে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছিলেন। গত মঙ্গলবার ইসরাইলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে নতুন সরকার গঠন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ও আঞ্চলিক মিত্রকে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন। দেশগুলোকে সম্ভাব্য হামলার পাশাপাশি ইরানের পাল্টা আঘাত মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দুই কূটনীতিকের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তা ও প্রতিরক্ষা বিভাগের প্রতিনিধিরা কয়েকটি দেশকে জানিয়েছেন, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবারও সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। নতুন অভিযান কয়েক দিন স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কার কথাও জানানো হয়েছে। তবে ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি।

ইরানের পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এদিকে, পেন্টাগন গত মাসের শেষ দিকে প্রায় ৯ হাজার সেনাসদস্য নিয়ে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস থিওডর রুজভেল্ট এবং মেরিন সেনা বহনকারী কয়েকটি উভচর যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পাঠিয়েছে। এতে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সামরিক অভিযান নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি: রুবিও

ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে ট্রাম্প এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। শনিবার আটলান্টায় জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম। তবে এ বিষয়ে নতুন কোনো ঘোষণা দেওয়ার নেই।

রুবিও একই সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, কূটনৈতিক সমাধান সম্ভব হলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে আগ্রহী থাকবে।

কাতারের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনা

নতুন করে যুদ্ধ এড়াতে কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছে। শুক্রবার তেহরানে কাতারি প্রতিনিধিদের সঙ্গে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় আলোচনা করেন ইরানি কর্মকর্তারা। পরদিন শনিবার ইরানি আলোচকেরা দোহায় মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

আলোচনা পুনরায় শুরু এবং নতুন করে মার্কিন হামলা এড়ানোর পথ খুঁজতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। চিঠিটি ট্রাম্পের নির্দেশে পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, চিঠিটি তেহরানের উচ্চপর্যায়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে আপাতত মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকের পরিকল্পনা নেই। তিনি বলেন, সংলাপ শুরু ও বিস্তৃত সমঝোতার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চিঠির মাধ্যমে ইরানের অভ্যন্তরে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করা হলে তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি ভুল।

কাতার ও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে। তবে এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমঝোতা হয়নি।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে পাল্টাপাল্টি শর্ত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় বড় বাধা হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নৌ চলাচল। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান সেখানে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে।

কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আস্থা তৈরির জন্য ইরানকে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা দিয়েছিল। তবে তেহরান সেটিকে অপর্যাপ্ত মনে করেছে। অন্যদিকে, ইরানও নিজস্ব সাত দিনের প্রস্তাব দিয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার আগে ইরানের বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত এবং ইরানের সমর্থিত একটি নৌপথ ব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দেওয়ার শর্ত রয়েছে। ট্রাম্প এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আরাগচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের প্রস্তাব বাস্তবায়নের সময়সীমা পাঁচ দিন থেকে কমিয়ে দুই দিন করার বিষয়ে কাতারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তেহরানের অন্য দাবির মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানো, ইরানের তেল রপ্তানিতে ছাড় পুনর




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad