মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাত থেকে নিখোঁজ ছিলেন তাহসিফ। পরদিন বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে তাঁর মরদেহ ভাসতে দেখে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর দেওয়া হয়। পরে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা মরদেহ উদ্ধার করেন।
বৃহস্পতিবার নৌ পুলিশের ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মরদেহের বাইরে থেকে দৃশ্যমান কোনো আঘাত বা জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ছাড়া মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
কে ছিলেন তাহসিফ সাউরি১৯৯৮ সালে জন্ম নেওয়া তাহসিফ সাউরির বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল। তিনি পরিবারের সঙ্গে রাজধানীর উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে বসবাস করতেন। পরিচিতজনদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে যোগ দেন। কর্মজীবনে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টের পরিচিতিতে লেখা ছিল, ‘Veteran Military Pilot | Strategist | Entrepreneur’। মৃত্যুর তিন দিন আগে ভাটারায় এক অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদন শেয়ার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন তিনি।
৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে বিতর্ক২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। ওই দিন গণভবন এলাকা থেকে তাঁর দেশত্যাগের ঘটনাপ্রবাহের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ধারণ ও প্রকাশের সঙ্গে তাহসিফের নাম জড়িয়ে যায়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও ভিডিওটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে তাহসিফ নিজেই ভিডিওটি ধারণের বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর পরিচিতজনদের কারও কারও দাবি, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নেতিবাচক প্রচার শুরু হয়। ফলে ভিডিওটি ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক তাঁর পরিচিতির অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে ওঠে।
বিমানবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে যা জানা যায়তাহসিফের বিমানবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট এক বিবৃতিতে জানায়, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফীকে বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে তাঁদের অবসরের সঙ্গে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও উল্লেখ করা হয়। এর আগে একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ওই দুই কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর দাবি করা হয়েছিল। আইএসপিআর ওই দাবিকে বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করে।
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহনৌ পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারের সময় তাহসিফের পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো জামা। তাঁর হাতে একটি ঘড়ি ছিল এবং পকেটে পাওয়া যায় একটি আইফোন। ফোনের সূত্র ধরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নৌ পুলিশ।
তাহসিফের মৃত্যু, ৫ আগস্টের ভিডিও নিয়ে বিতর্ক এবং বিমানবাহিনী থেকে তাঁর অবসর—তিনটি বিষয়কে ঘিরে আলোচনা তৈরি হলেও এগুলোর মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হবে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক