কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরসহ হাওড়াঞ্চলে কৃষিকাজে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বাড়ছে। পুরুষ শ্রমিকের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের প্রয়োজনীয়তায় ধান রোপণ, চারা তোলা, আগাছা পরিষ্কার, ধান শুকানো ও ফসল বাছাইয়ের মতো কাজে তাঁদের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। তবে কৃষিতে নারীর চাহিদা বাড়লেও মজুরিতে বৈষম্য রয়ে গেছে। একই ধরনের কাজে পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকেরা অনেক কম মজুরি পাচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য ও সাম্প্রতিক মাঠপর্যায়ের চিত্র অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর ও আশপাশের নিকলী, অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন উপজেলায় নারী শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। বিপরীতে পুরুষ শ্রমিকেরা পাচ্ছেন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বা তারও বেশি। ফলে কৃষিতে নারীর শ্রমের চাহিদা বাড়লেও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হয়নি।
শ্রমিক সংকটে বাড়ছে নারীর কদরবাজিতপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ১৫ হাজার ৪৯১ হেক্টর। এর মধ্যে এক ফসলি জমি ৭ হাজার ৫৫০ হেক্টর। উপজেলায় কৃষক পরিবারের সংখ্যা প্রায় ৩৬ হাজার ৪০০। ধান, ভুট্টা, সরিষা, পাট ও বিভিন্ন ধরনের সবজি এখানকার প্রধান ফসল।
এ বিশাল কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নারী শ্রমিকদের অবদান বাড়লেও তাঁদের সংখ্যা ও কাজের ধরন নিয়ে উপজেলাভিত্তিক নির্দিষ্ট সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে কিশোরগঞ্জের হাওড়াঞ্চলে শ্রমিক সংকট প্রকট ছিল। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধান কাটার মৌসুমে অতিরিক্ত মজুরি দিয়েও অনেক এলাকায় পুরুষ শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো স্থানে দৈনিক ২ হাজার টাকা মজুরি দিয়েও শ্রমিক সংকট কাটেনি।
বাজিতপুরের দিঘিরপাড় এলাকার আছানপুর, বোয়ালি-শিবপুর ও শিয়ালদীপাড় গ্রামের কৃষক মোক্তাদির, জুলহাস ও মিনহাজুলের ভাষ্য, সময়মতো শ্রমিক পাওয়া না গেলে হাওড়ের ফসল ঝুঁকিতে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে পুরুষ শ্রমিকের পাশাপাশি দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব—এমন কৃষিকাজে নারী শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে।
সংসারের চাপে মাঠে নামছেন নারীরাহাওড়াঞ্চলের নারী শ্রমিক মর্জিনা, হাসুবিবি, খাদিজা ও কমলি বেগমের বক্তব্য অনুযায়ী, সংসারের আয় বাড়ানো, সন্তানের পড়াশোনার খরচ, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে তাঁরা কৃষিকাজে যুক্ত হচ্ছেন। মজুরি কম হলেও কাজের সুযোগ তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
জেলার ২০২৪ সালের একটি শ্রমবাজার মূল্যায়নেও তরুণীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার চিত্র উঠে এসেছে। ওই জরিপে বাজিতপুরের তরুণীদের মধ্যে ১২ শতাংশের কৃষি খাতে এবং ৮৮ শতাংশের সেবা খাতে যুক্ত থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে একদিকে শ্রমিক সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব, অন্যদিকে গ্রামীণ নারীদের আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে নারীদের কম মজুরিতে নিয়োগের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিদ্যমান বৈষম্য আরও স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিহাওড়াঞ্চলে কৃষিকাজে নারী শ্রমিকের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে তাঁদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ যাতায়াত, বিশ্রামের সুযোগ, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে।
বাজিতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, উপজেলায় নারী কৃষিশ্রমিকের প্রকৃত সংখ্যা, কোন হাওড়ে তাঁদের উপস্থিতি বেশি, কাজের ধরন, নারী-পুরুষের মজুরির পার্থক্য এবং মৌসুমভিত্তিক আয় নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অফিস ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা রয়েছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক