যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকটে লাভবান হচ্ছে যারা

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৭ দুপুর
  • ২৫০৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুললেও অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে রাশিয়া। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, বেড়েছে রুশ তেলের চাহিদাও। পাশাপাশি রুশ জ্বালানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ মস্কোর জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

তবে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত বা আরও বিস্তৃত হোক, তা রাশিয়া চায় কি না—এ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। কারণ, সংঘাত থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পেলেও এর অনিশ্চিত পরিণতি রাশিয়ার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আলজাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধকে ঘিরে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ আঞ্চলিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে মস্কো।

তেহরান সফরে লাভরভ, জোরালো হচ্ছে কৌশলগত সম্পর্ক

সোমবার তেহরানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। যুদ্ধকালীন সহযোগিতা জোরদার এবং সংঘাত-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করা এ সফরের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, রাশিয়া ও ইরান নিজেদের চলমান সংঘাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে চায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত আঞ্চলিক ব্যবস্থায় যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রভাব নিশ্চিত করতে আগ্রহী মস্কো।

মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আরাগচি লেখেন, দুই দেশের ইতিহাসে ইরান ও রাশিয়া এখনকার মতো ঘনিষ্ঠভাবে কখনো কাজ করেনি।

তবে এই ঘনিষ্ঠতার অর্থ এই নয় যে, দুই দেশ একে অপরের প্রতিরক্ষায় সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ২০ বছর মেয়াদি সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করেন। ওই বছরের অক্টোবরে চুক্তিটি কার্যকর হয়। এতে সহযোগিতার কাঠামো থাকলেও পারস্পরিক সামরিক প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর আরও ঘনিষ্ঠ মস্কো-তেহরান

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর মস্কো ও তেহরানের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। রাশিয়াকে শাহেদ ড্রোনের প্রযুক্তি সরবরাহ করে ইরান। পরে ওই প্রযুক্তির ভিত্তিতে নিজস্ব সংস্করণের ড্রোন তৈরি করে রাশিয়া। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, ইরান রাশিয়াকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রও সরবরাহ করেছে।

ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে রুশ বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে নেওয়ার পর তাঁদের ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনার কথাও জানিয়েছেন লাভরভ। যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কেন্দ্রটি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো গোয়েন্দা প্রতিবেদনের বরাতে জানিয়েছে, রাশিয়া ও চীন ইরানকে স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া ছবি এবং অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব প্রতিবেদন নাকচ করেছেন। ফলে ইরানকে রাশিয়ার সহায়তার প্রকৃত মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

তেলের বাজারে অস্থিরতা, বাড়ছে রাশিয়ার আয়

ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম প্রায় ৭২ ডলার থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১২০ ডলারে পৌঁছায়। ২০ অক্টোবরও আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট তেলের দাম ছিল ১০৯ ডলারের ওপরে।

উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বিকল্প উৎস হিসেবে রুশ তেলের চাহিদা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে রাশিয়ার রাজস্বেও। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল নাগাদ দেশটির প্রধান তেল কর থেকে আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।

জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চাপও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে প্রভাব ফেলেছে। মার্চ থেকে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় সমুদ্রপথে আগে থেকেই বোঝাই করা রুশ তেল বিক্রির অনুমতি দিয়ে আসছে। চলতি মাসে রাশিয়ার ডিজেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার ছাড় ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গত শুক্রবার রাশিয়া ও দেশটির তেল-গ্যাসের ক্রেতাদের ওপর নতুন করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেন ট্রাম্প। এতে তাঁর নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির নিষেধাজ্ঞা সমর্থনকারী সদস্যদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের যুক্তি, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার সুযোগ থেকে রাশিয়াকে অযথা দূরে ঠেলে দিতে চান না তিনি। আর এই অবস্থানকেই নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে মস্কো।

ইউক্রেন ইস্যুতেও সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের সহযোগী গবেষক জন লফের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থের সমন্বয় ঘটানোর সুযোগ খুঁজছে ক্রেমলিন। রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধে ওয়াশিংটনের নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে মস্কো।

লফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়তে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নীতির মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে তা রাশিয়ার জন্য কৌশলগত সুবিধা বয়ে আনতে পারে।

অর্থাৎ, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট সংকট শুধু রাশিয়ার আয় বাড়াচ্ছে না; ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও মস্কোর দর-কষাকষির সুযোগ বাড়াচ্ছে।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হোক, এমনটা কি চায় মস্কো?

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ থেকে রাশিয়ার লাভের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তেলের উচ্চমূল্য, বিকল্প জ্বালানি উৎস হিসেবে রুশ তেলের চাহিদা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেশটির অর্থনীতিকে সুবিধা দিচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অচলাবস্থা চলতে থাকলে ওয়াশিংটনের মনোযোগ ও কূটনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়তে পারে।

তবে রাশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক নিকিতা স্মাগিন মনে করেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মস্কো কিছু সুবিধা পেলেও যুদ্ধের আরও বিস্তার তারা সম্ভবত চাইবে না। কারণ, সংঘাতের পরিণতি অনিশ্চিত এবং তা রাশিয়ার জন্যও অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ফলে রাশিয়ার অবস্থানকে সরলভাবে যুদ্ধের পক্ষে বা বিপক্ষে হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সংঘাত থেকে সুবিধা নেওয়া এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া ঠেকানো—দুই স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে চাইছে মস্কো।

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাশিয়ার সুযোগ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে। নাদের হাশেমির মতে, এ ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের তুলনায় মস্কোর অবস্থান কিছুটা সুবিধাজনক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে রাশিয়া ভূমিকা রাখতে পারে।

গত ৯ অক্টোবর ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে পুতিন জানিয়েছিলেন, ইরানের অবস্থান তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছেন। এ ঘটনা দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মস্কোর সম্ভাব্য ভূমিকার ইঙ্গিত দেয়।

তবে সংঘাতের সমাধানে পুতিনের সহায়তা নিতে ট্রাম্প কতটা আগ্রহী, তা স্পষ্ট নয়। ইরান নিয়ে মার্কিন নীতিতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার জন্য নভেম্বরে চীনের শেনজেনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) সম্মেলনের ফাঁকে পুতিন, ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক নিয়ে আলোচনার কথা জানিয়েছিল ক্রেমলিন। তবে ওই সম্মেলনে ট্রাম্প যোগ দেবেন কি না, তা হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেনি। এমন বৈঠক হলে ইরান যুদ্ধও আলোচনায় আসতে পারে বলে মনে করেন হাশেমি।

সংঘাতের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে রাশিয়ার লাভ

লাভরভ জানিয়েছেন, অক্টোবরের শেষ দিকে মস্কোয় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলোর ফোরামের সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অংশ নেবেন বলে আশা করছে রাশিয়া।

অন্যদিকে, ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শিগগিরই শেষ করার হুমকি দিয়েছেন। জবাবে আরাগচি বলেছেন, তাঁদেরও কিছু কাজ এখনো বাকি রয়েছে।

সব মিলিয়ে, ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে রাশিয়া একদিকে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে, অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েন থেকে নিজেদের স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করছে। তবে সংঘাত কত দিন স্থায়ী হবে এবং এর পরিণতি কী দাঁড়াবে, তার ওপরই নির্ভর করছে রাশিয়ার বর্তমান সুবিধা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad