পাঁচ দিনের রিমান্ডের চার দিন শেষ হওয়ার পর গত বুধবার ডনকে আদালতে হাজির করে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করে সিআইডি। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। আদালতে দেওয়া তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ডনের জড়িত থাকার বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনে তাকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
‘হত্যা’ নিয়ে সরাসরি জবাব নেইসিআইডির প্রতিবেদনে ডনের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ থাকলেও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত সংস্থার বক্তব্যে স্পষ্টতা নেই। গতকাল বৃহস্পতিবার সিআইডির মুখপাত্র ছুফি উল্লাহর কাছে জানতে চাওয়া হয়—ডনের সম্পৃক্ততার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে সালমান শাহর মৃত্যুকে এখন কি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখছে সিআইডি? একই সঙ্গে পিবিআইয়ের আগের ‘আত্মহত্যা’র তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হয়েছে কি না, তাও জানতে চাওয়া হয়।
তবে এসব প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি তদন্ত চলমান থাকার কথা জানান।
মামলাটি সিআইডির ঢাকা মেট্রো দক্ষিণ ইউনিট তদন্ত করছে। ওই ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার গোলাম বেনজীরের কাছেও একই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সিআইডির মিডিয়া বিভাগের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
সূত্রের বরাতে এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ডনের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জানতে চাইলেও দুই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কোনো স্পষ্ট উত্তর দেননি। ফলে ডনের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা বলা হলেও তিনি ঠিক কী করেছেন, কার সঙ্গে করেছেন কিংবা সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তার ভূমিকা কী—তা এখনো প্রকাশ্যে স্পষ্ট নয়।
রিমান্ড নিয়ে ক্ষুব্ধ নীলা চৌধুরীডনের দ্রুত রিমান্ড শেষ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী। যুক্তরাজ্য থেকে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ডন কোনো সাধারণ আসামি নন; তিনি ৩০ বছর আগের আলোচিত হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ও অভিযুক্ত।
রিমান্ড শুরুর জন্য সাত দিনের আবেদন কমিয়ে পাঁচ দিন করা এবং চার দিনের মাথায় অসুস্থতার কথা বলে তাকে আদালতে হাজির করার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। নীলা চৌধুরীর ভাষায়, এটি ‘ফানি নাটক’। মূল তথ্য উদ্ধার না করেই তাকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনের দুর্বলতা অথবা অন্য কোনো দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তদন্তকারী সংস্থা কোনো তথ্য প্রকাশ করছে না বলেও অভিযোগ করেন নীলা চৌধুরী। রহস্যের মূল সূত্র উদ্ধারে প্রয়োজন হলে ডনের মুখোমুখি তার ভাই আলমগীর কুমকুম ও নীলা চৌধুরীকে ভার্চুয়ালি বসিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান তিনি।
একই সঙ্গে মামলার এজাহারভুক্ত ১১ আসামির মধ্যে শুধু ডনকে গ্রেপ্তার করা এবং অন্যরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানো নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন সালমান শাহর মা।
চার দিনের মাথায় শেষ রিমান্ডআদালতের আদেশে গত ৬ সেপ্টেম্বর ডনকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। তবে চার দিনের মাথায় ৯ সেপ্টেম্বর তাকে আদালতে হাজির করা হয়। সিআইডি জানায়, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তদন্তের স্বার্থে তাকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন। আদালত সিআইডির আবেদন মঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
এর আগে গত ৯ আগস্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিদেশ যাওয়ার চেষ্টার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। পরে তাকে সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। ১২ আগস্ট তার জামিন আবেদনও নাকচ করেন আদালত।
পরে সিআইডি ডনকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে। শুনানি শেষে ২৭ আগস্ট আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ড আবেদনে সিআইডি ডনকে অত্যন্ত কৌশলী ও ধূর্ত প্রকৃতির বলে উল্লেখ করেছিল। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে মামলার প্রকৃত রহস্য এবং অন্য আসামিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আদালতকে জানানো হয়। এ ছাড়া বিদেশ যাওয়ার চেষ্টার কারণ এবং এর পেছনে কারও ইন্ধন ছিল কি না, তাও জানার চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছিল তদন্ত সংস্থা।
আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।
ডনের বক্তব্যে অসংগতির দাবিআদালতে দেওয়া সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডন ও সালমান শাহ একাধিক চলচ্চিত্রে একসঙ্গে কাজ করেছেন। মামলার এজাহারভুক্ত পলাতক আসামিদের কয়েকজনকেও ডন চেনেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন।
তবে মামলার মূল ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তার বক্তব্যে অসংগতি এবং তথ্য এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে বলে তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু ডনের জবানবন্দির ওপর নির্ভর করছে না সিআইডি। সালমান শাহর মৃত্যুর আগে, ঘটনার সময় এবং পরে ডনের আচরণ ও গতিবিধিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এসব তথ্য থেকে পাওয়া সূত্র অন্যান্য আলামত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা।
যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজন হলে ডনকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
তিন দশক পর হত্যা মামলা১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহর লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়। এরপর দীর্ঘ সময়ে একাধিক তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া চলে।
বিভিন্ন তদন্তে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন বলে মত দেওয়া হলেও তার পরিবার শুরু থেকেই তা প্রত্যাখ্যান করে আসছে। চারটি তদন্তের ফল আত্মহত্যার দিকে গেলেও পরিবার হত্যার অভিযোগে আইনি লড়াই চালিয়ে যায়।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর আদালত সালমান শাহর মায়ের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের নির্দেশ দেন। পরদিন তার মামা মোহাম্মদ আলমগীর রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও আশরাফুল হক ডনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, পূর্বপরিকল্পিতভাবে এবং পরস্পর যোগসাজশে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে।
এখন ডনের সম্পৃক্ততা নিয়ে সিআইডির প্রতিবেদনে নতুন তথ্যের উল্লেখ থাকলেও, সেই তথ্যের ভিত্তিতে সালমান শাহর মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্তের পরবর্তী অবস্থান কী—সেটিই হয়ে উঠেছে মামলার নতুন প্রশ্ন।

প্রথম দর্পণ,বিনোদন ডেক্স