চিঠিতে আকিদা, দেওবন্দি-হানাফি আদর্শ, কওমি ঐতিহ্য এবং জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যের যৌক্তিকতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। কওমি অঙ্গনে জামায়াতের সঙ্গে জোটের বিরোধিতা ও আদর্শিক দূরত্ব নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই এ চিঠি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী হবিগঞ্জের মাদ্রাসা নূরে মদিনার পরিচালক। তিনি ধর্মীয় আলোচক ও বিতার্কিক হিসেবে পরিচিত। মামুনুল হকের তিন মুরুব্বি হলেন—মিরপুরের মাদ্রাসা দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব মাওলানা লিয়াকত আলী, গাজীপুরের অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান চৌধুরী (দেওনার পীর) এবং তাঁর বড় ভাই মাওলানা মাহফুজুল হক।
আকিদা নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা চাওয়া
চিঠিতে মামুনুল হকের একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ওলীপুরী দাবি করেছেন, সেখানে চার মাজহাব—হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি—এর আকিদার সঙ্গে সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদার তেমন কোনো পার্থক্য নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ওলীপুরীর মতে, চার মাজহাবের আকিদার সঙ্গে সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদার মৌলিক ও ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। কওমি অঙ্গনের একজন শীর্ষ আলেমের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য এলে সাধারণ আলেম ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
দাঁড়িপাল্লাকে আলেমদের প্রতীক বলার প্রশ্ন
জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে ইনসাফ ও ওলামায়ে কেরামের প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করার বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন ওলীপুরী। তাঁর প্রশ্ন, যেসব দলের বিরুদ্ধে আকাবির, সাহাবা ও সালাফদের সঙ্গে বে-ইনসাফির অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন, সেই দলের নির্বাচনি প্রতীক কীভাবে আলেমদের প্রতীক হতে পারে?
এ ছাড়া দেওবন্দি ও হানাফি আলেমদের আকিদা সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়েছে বলে মামুনুল হকের বক্তব্যের সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের আহ্বান শত বছরের দেওবন্দি-হানাফি ঐতিহ্যের ওপর আঘাতের শামিল। এ বিষয়ে মামুনুল হকের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি।
জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের ঐতিহাসিক নজির নিয়েও আপত্তি
জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্যের পক্ষে শাইখুল হিন্দ (রহ.)-এর কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্যের ঐতিহাসিক নজির তুলে ধরার বিষয়টিও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ওলীপুরীর দাবি, ওই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক ঐক্যের তুলনা যথাযথ নয়। এ ধরনের তুলনা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, মামুনুল হকের বাবা শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) তাঁর বুখারি শরিফের ব্যাখ্যাগ্রন্থে মওদুদীর বিভিন্ন বক্তব্যের দলিলভিত্তিক খণ্ডন করেছেন। চিঠিতে ওলীপুরী মওদুদীবাদ বলতে জামায়াতে ইসলামীকে বুঝিয়েছেন।
এ ছাড়া জিহাদকে মূল আকিদা হিসেবে উপস্থাপন এবং ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা ব্যবহারের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। একই সঙ্গে দেওবন্দি আকিদার সঠিক ব্যাখ্যা এবং এ বিষয়ে মামুনুল হকের অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগেও চিঠি দিয়েছিলেন প্রবীণ আলেম
মামুনুল হকের তিন মুরুব্বির কাছে এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর চিঠি পাঠিয়েছিলেন বগুড়া জামিল মাদ্রাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস ও প্রবীণ আলেম মাওলানা আব্দুল হক আজাদ। জামায়াতের সঙ্গে মামুনুল হকের সংশ্লিষ্টতা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে তিনি ওই চিঠি লেখেন।
বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে আব্দুল হক আজাদ জানান, চিঠি পাঠানোর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো জবাব পাননি তিনি।
চিঠিতে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ সেপ্টেম্বর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মামুনুল হক বলেছিলেন, তাঁর কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তা যেন তাঁর তিন মুরুব্বির কাছে উপস্থাপন করা হয়। মুরুব্বিরা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তিনি তা মেনে নেবেন। ওই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই আব্দুল হক আজাদ চিঠি পাঠিয়েছিলেন।
১১ দলীয় জোটে ভাঙন, কওমি দলগুলোর পৃথক উদ্যোগ
সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ১১টি দলকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল ১১ দলীয় নির্বাচনি জোট। তবে নির্বাচনের ঠিক আগে জোট থেকে বেরিয়ে যায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত দলটি আটটি আসনে এককভাবে নির্বাচন করে। নির্বাচনের পর খেলাফত আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসও জোট ছাড়ে।
বর্তমানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে রয়েছে।
অন্যদিকে, কওমি ধারার ইসলামি দলগুলোকে একটি অভিন্ন প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াতের সঙ্গে আকিদাগত দূরত্ব ও আদর্শিক মতভিন্নতার কারণে কওমি ঘরানার দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২২ অক্টোবর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মাখযানুল উলুম মাদ্রাসায় সাতটি কওমি ধারার ইসলামি দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ‘সমমনা ইসলামী দল’ নামে অভিন্ন ব্যানারে কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
নতুন এ উদ্যোগে রয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট (রাজী), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন।
তবে দলগুলোর রাজনৈতিক অবস্থানে ভিন্নতা রয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপি জোটে এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে রয়েছে। দলগুলো নিজ নিজ স্বতন্ত্র পরিচয় বজায় রেখেই সম্মিলিতভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। আগামী ৫ ডিসেম্বর পরবর্তী বৈঠক আয়োজনের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
কওমি অঙ্গনে আকিদা ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে চলমান মতপার্থক্যের মধ্যে ওলীপুরীর এই চিঠি জামায়াতের সঙ্গে জোটের প্রশ্নে বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক