নতুন বইগুলো হলো—চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’।
এনসিটিবি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে পাণ্ডুলিপি মুদ্রণের জন্য প্রেসে পাঠানো হবে।
অনুমোদনের পর শুরু হবে মুদ্রণএনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য পাঠানো হবে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, বই মুদ্রণের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিসির অনুমোদন পাওয়া গেলে আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বই ছাপানোর কাজ শেষ করার আশা করছে সংস্থাটি।
এনসিটিবি জানায়, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের পরামর্শে পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করা হয়।
খেলাধুলায় শারীরিক সক্ষমতা ও আত্মরক্ষার শিক্ষাচতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইটি ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুস্থ জীবনযাপনে অভ্যস্ত করা এবং ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলাই এর মূল লক্ষ্য।
বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়ম তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষার কৌশলও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
খেলাধুলা বা দৌড়ানোর সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া ও হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে। প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার, আঘাত প্রতিরোধ, পুষ্টি ও সামাজিক দক্ষতার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বইটিতে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্পের মাধ্যমে সামাজিক বাধা পেরিয়ে মেয়েদের ফুটবল দল গঠন ও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জনের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে খেলাধুলাকে শুধু বিনোদন নয়, সম্ভাব্য পেশা ও জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যম হিসেবেও উপস্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিচয়চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি ১১টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে দেশের ইতিহাস, ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও পিঠা-পুলির মতো সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের পাশাপাশি পরিবারে পারস্পরিক সহযোগিতা ও যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ও এতে স্থান পেয়েছে।
বইটিতে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং বিজয়ীদের ছবি যুক্ত করার কথাও জানিয়েছে এনসিটিবি।
‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেসে’ আনন্দের মাধ্যমে শেখাষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি ছয়টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। এতে প্রচলিত মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষার প্রস্তুতির বাইরে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে শেখার ধারণা তুলে ধরা হয়েছে।
বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে। শেখাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
এনসিটিবির কর্মকর্তাদের মতে, এ পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের কাছে শেখাকে কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার উপায় হিসেবে না দেখে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার অংশ হিসেবে তুলে ধরতে সহায়তা করবে।
কারিগরি শিক্ষায় হাতে-কলমে দক্ষতাষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি আটটি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, সমস্যা চিহ্নিত করা এবং বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে উৎসাহিত করাই এর লক্ষ্য।
বইটিতে কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষুদ্র উদ্যোগের সম্ভাবনা, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা কীভাবে বাস্তবে কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে দক্ষতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরে অন্যান্য শ্রেণিতেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাপ্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি গড়ে তোলার পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মদক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি জানান, পরিকল্পনা অনুযায়ী চতুর্থ শ্রেণিতে চালু হতে যাওয়া ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিষয়ক বই দুটি পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শওকত আলী খান বলেন, নতুন বইগুলো চালু হলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ২৪ অক্টোবর ২০২৬; জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক