সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েন মাদকাসক্ত ব্যক্তির মা-বাবা। যে সন্তানকে ঘিরে তাঁদের হাজারো স্বপ্ন, সেই সন্তানকে বাঁচানোর জন্য তাঁরা একসময় নিজেদের শেষ সম্বলটুকুও ব্যয় করতে বাধ্য হন। চিকিৎসার খরচ, ধারদেনা, সংসারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটানোর চাপ—সবকিছু মিলিয়ে তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। সন্তানের মাদক গ্রহণ বন্ধ করতে বোঝানো, শাসন করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কিংবা স্বজনদের সহায়তা চাওয়ার পরও যখন প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে না, তখন তাঁদের মধ্যে জন্ম নেয় গভীর হতাশা ও অসহায়ত্ব। অনেক মা-বাবা লোকলজ্জার ভয়ে প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের কাছেও সমস্যার কথা বলতে পারেন না। বাইরে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে তাঁরা প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণায় ভোগেন।
দাম্পত্য জীবনেও মাদকের প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। পরিবারের উপার্জন মাদকের পেছনে ব্যয় হলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা, বাড়িভাড়া দেওয়া, সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন কিংবা চিকিৎসা করানো কঠিন হয়ে পড়ে। সংসারের দায়িত্ব একজনের কাঁধে এসে পড়লে বাড়ে বিরোধ ও মানসিক চাপ। অবিশ্বাস, অর্থসংকট ও পারিবারিক অশান্তি থেকে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি গড়ায় নির্যাতন, বিচ্ছেদ কিংবা পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তাহীনতা পর্যন্ত। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা অনেক সময় এসব সংকটের নীরব শিকার হয়। তারা এমন এক পরিবেশে দিন কাটায়, যেখানে শান্তির বদলে বিরাজ করে ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা।
সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় পরিবারের শিশুরা। যে বয়সে তাদের পড়াশোনা, খেলাধুলা ও আনন্দে বেড়ে ওঠার কথা, সে বয়সেই তারা দেখে মা-বাবার ঝগড়া, সংসারের টানাপোড়েন কিংবা পরিবারের সদস্যদের অসহায় কান্না। কখনো অর্থাভাবে তাদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, কখনো প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ ও পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত হতে হয়। পরিবারের অশান্তি তাদের মনোযোগ, আত্মবিশ্বাস ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক শিশু বন্ধুদের সামনে পারিবারিক পরিস্থিতি প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে, সামাজিক অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলে কিংবা নিজের কষ্ট কাউকে বলতে পারে না। এভাবে একজনের মাদকাসক্তির মূল্য দিতে হয় এমন শিশুদেরও, যাদের এই সংকট তৈরিতে কোনো দায় নেই।
মাদকের কারণে পরিবারের সঞ্চয় নিঃশেষ হয়ে গেলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় আরও গভীর হয়। কখনো জমি বা মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করতে হয়, কখনো ঋণ নিতে হয়, আবার কখনো পরিবারের অন্য সদস্যদের নিজেদের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সংসার চালাতে হয়। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মাদকাসক্ত হলে আয় কমে যেতে পারে; আর উপার্জনের অর্থ মাদকের পেছনে ব্যয় হলে পুরো পরিবার দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে পরিবারের অন্য সদস্যদের অতিরিক্ত কাজ করতে হয়, সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় কাটছাঁট করতে হয়। ফলে মাদকের ক্ষতি কেবল বর্তমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরবর্তী প্রজন্মের সম্ভাবনাকেও সংকুচিত করে।
পারিবারিক বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক অপমান ও একাকিত্ব। প্রতিবেশীর কটূক্তি, আত্মীয়স্বজনের দূরত্ব কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে বিব্রতকর পরিস্থিতির আশঙ্কায় অনেক পরিবার নিজেদের গুটিয়ে নেয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তির ভুলের দায়ও কখনো কখনো পরিবারের অন্য সদস্যদের বহন করতে হয়। অথচ মা, বাবা, স্ত্রী, স্বামী কিংবা সন্তান—কেউই স্বজনের মাদকাসক্তির জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে দায়ী নন। তাঁদের দোষারোপ করা বা সামাজিকভাবে হেয় করা সমস্যার সমাধান নয়; বরং এতে পরিবারটি আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়।
মাদকের বিস্তার সামাজিক অপরাধের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ কেউ চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা কিংবা অন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। মাদক কারবারের বিস্তার এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তবে এটিও মনে রাখতে হবে, সব মাদকাসক্ত ব্যক্তি অপরাধে জড়িত নন। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি যারা মাদক উৎপাদন, সরবরাহ ও অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ও নিরপেক্ষ আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধ দমন এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সুস্থ জীবনে ফেরানোর উদ্যোগ একসঙ্গে চালাতে হবে।
এই সংকট মোকাবিলায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো জরুরি। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু অপমান, তিরস্কার বা ঘর থেকে বিতাড়িত করার মাধ্যমে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন চিকিৎসকের পরামর্শ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং ও উপযুক্ত পুনর্বাসন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদেরও মানসিক সহায়তা দিতে হবে, যাতে তাঁরা দীর্ঘদিনের চাপ সামলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে সহজে পৌঁছানোর সুযোগ, চিকিৎসার ব্যয় বহনে সহায়তা এবং পুনর্বাসনের পর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাদক কারবারের উৎস ও সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত করে কার্যকর অভিযান চালাতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। অভিভাবকদেরও সন্তানের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে আতঙ্কিত বা অপমানিত না হয়ে সহানুভূতির সঙ্গে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নিতে হবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু মাদক উদ্ধার কিংবা অপরাধী গ্রেপ্তার নয়; এর অর্থ বিপর্যস্ত পরিবারকে রক্ষা করা, অসহায় মা-বাবার পাশে দাঁড়ানো, শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সুস্থ জীবনে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া। একটি পরিবার ভেঙে পড়লে তার ক্ষত বহন করেন পরিবারের প্রতিটি সদস্য। তাই মাদক প্রতিরোধের প্রতিটি উদ্যোগে পারিবারিক ভোগান্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
মাদকের বিস্তার রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মাদক কারবারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, বিপর্যস্ত পরিবারের জন্য মানসিক ও সামাজিক সহায়তা এবং শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একটি পরিবারের কান্না যেন আরেকটি পরিবারের নিয়তি না হয়—এই হোক মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের অঙ্গীকার। পরিবার বাঁচলে সমাজ বাঁচবে, আর সমাজ বাঁচলেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক