মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে চাই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ, কার্যকর জবাবদিহি

  • মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫৭ সকাল
  • ৭৭৯৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg প্রতীকী ফটো।

মহাসড়কে চাঁদাবাজির অভিযোগ নতুন নয়। পণ্যবাহী ট্রাক, বাস, পিকআপ, পরিবহনশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঘিরে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। পরিবহন ব্যয় বাড়ার চাপ তৈরি হয়, পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। অথচ এই সমস্যা প্রতিরোধে শুধু অভিযান, আশ্বাস কিংবা সাময়িক তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ।

প্রশ্ন হলো, মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে ঠিক কী করা দরকার?

প্রথমত, চাঁদাবাজির ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে তালিকা প্রকাশ করতে হবে। হাইওয়ে পুলিশ, জেলা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে পরিবহনশ্রমিক, চালক, মালিক সমিতি এবং ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে অভিযোগ সংগ্রহ করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করতে হবে। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে। এসব স্থানে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা নির্দিষ্ট সময় পরপর পর্যালোচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, চাঁদাবাজির অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর হটলাইন ও অনলাইন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চালক বা পরিবহনশ্রমিক যেন গাড়ি থামিয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে না পড়ে সহজেই অভিযোগ জানাতে পারেন, সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ গ্রহণের পর একটি শনাক্তকরণ নম্বর দিতে হবে এবং অভিযোগের অগ্রগতি সম্পর্কে অভিযোগকারীকে জানাতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগকারীর পরিচয় ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, মহাসড়ক ও সংশ্লিষ্ট টার্মিনালে বৈধ অর্থ আদায়ের নিয়ম দৃশ্যমান করতে হবে। সরকারি টোল, নির্ধারিত ফি ও আইনসম্মত জরিমানার পরিমাণ, আদায়ের স্থান এবং অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করতে হবে। যেখানে প্রযোজ্য, সেখানে রসিদ বা ডিজিটাল পরিশোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নির্ধারিত নিয়মের বাইরে কোনো অর্থ দাবি করা হলে তা যাচাই ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে। এতে বৈধ আদায় ও অবৈধ চাঁদাবাজির পার্থক্য পরিষ্কার হবে।

চতুর্থত, অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রাথমিক যাচাই সম্পন্ন করার প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। গুরুতর অভিযোগে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিক তদন্ত ও আইনগত পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রমাণ সংরক্ষণ, মামলা দায়ের এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কয়েকজনকে আটক করাই যেন সাফল্যের মাপকাঠি না হয়; পুনরাবৃত্তি বন্ধ হয়েছে কি না, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে।

পঞ্চমত, দায়িত্ব পালনে অবহেলার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা পর্যালোচনা করতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা বা অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তবে শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত না করে প্রমাণ ও যথাযথ প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ষষ্ঠত, নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কতটি অভিযোগ পাওয়া গেছে, কতটির তদন্ত শেষ হয়েছে, কতটি ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং কতটি অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন—এসব তথ্য প্রকাশ করতে পারে। ব্যক্তিগত তথ্য ও তদন্তের গোপনীয়তা রক্ষা করে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে জনগণ প্রশাসনিক কার্যক্রমের অগ্রগতি যাচাই করতে পারবেন।

সপ্তমত, পরিবহনশ্রমিক ও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। চাঁদাবাজির অভিযোগ জানানোর কারণে কেউ যাতে হুমকি, হয়রানি বা প্রতিশোধের শিকার না হন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবহনমালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকেও অভিযোগ সংগ্রহ এবং তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। তবে কোনো সংগঠন যেন অভিযোগের আড়ালে বেআইনি অর্থ আদায় বা প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষকে হয়রানি করার সুযোগ না পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

এই পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়নে হাইওয়ে পুলিশকে মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও আইন প্রয়োগে, জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে সমন্বয় ও অভিযোগের তদন্তে এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষকে বৈধ ফি ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দায়িত্ব বণ্টন করে বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। কোন দপ্তর কোন কাজ করবে, তার অগ্রগতি কীভাবে যাচাই হবে এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসবও স্পষ্ট থাকতে হবে।

মনে রাখতে হবে, মহাসড়কে চাঁদাবাজির মূল্য শুধু চালক বা পরিবহনমালিক দেন না। পরিবহন ব্যয়ের চাপ পণ্যের দামে প্রতিফলিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ ক্রেতা। অবৈধ অর্থ আদায়ের কারণে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়লে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের জীবিকাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই এই সমস্যা প্রতিরোধ করা জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমাদের দাবি স্পষ্ট: ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করতে হবে, নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, বৈধ ফি প্রকাশ করতে হবে, অভিযোগের দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে অপরাধ প্রমাণিত হলে পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধের সাফল্য শুধু অভিযানসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না। সাফল্য হবে তখনই, যখন চালককে অবৈধ অর্থ দেওয়ার ভয় নিয়ে রাস্তায় নামতে হবে না, পরিবহনশ্রমিক নিজের উপার্জনের ন্যায্য অংশ ঘরে নিতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষ অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের চাপ থেকে মুক্তি পাবেন। এখন প্রয়োজন ঘোষণার চেয়ে বাস্তবায়ন, বিচ্ছিন্ন তৎপরতার চেয়ে ধারাবাহিক নজরদারি এবং আশ্বাসের চেয়ে পরিমাপযোগ্য ফলাফল।





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad