সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় মাদকসংক্রান্ত সংবাদ ও ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে এক সাংবাদিককে মারধর, তাঁর বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর এবং প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মালামাল লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শ্রমিক লীগ নেতা বেলাল বিশ্বাসসহ একাধিক ব্যক্তির নাম এসেছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের দাবি, মাদকসংক্রান্ত ভিডিও ধারণের জের ধরে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হামলার শিকার হতে হয়েছে এবং পরে তাঁর বাড়িতেও হামলা চালানো হয়েছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনই ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে বিষয়গুলো গুরুতর হওয়ায় নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা জরুরি।
মাদকবিরোধী সংবাদে বাধা কেন?মাদক শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, পরিবার ও সমাজকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তরুণদের একটি অংশকে বিপথে ঠেলে দেওয়ার পাশাপাশি মাদককে ঘিরে নানা ধরনের অপরাধের বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। এ অবস্থায় মাদকের সরবরাহ, বিক্রি ও সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ প্রকাশ জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সাংবাদিকরা সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি হামলা, হুমকি বা হয়রানির মুখে পড়েন, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় থাকে না; এর প্রভাব পড়ে সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতার ওপরও। একজন সাংবাদিক যদি সংবাদ প্রকাশের কারণে নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা কিংবা সম্পদের সুরক্ষা নিয়ে শঙ্কিত থাকেন, তাহলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজনসলঙ্গার ঘটনায় সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগের পাশাপাশি তাঁর বাড়িতে হামলা, লুটপাট এবং তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা দরকার। অভিযোগকারী ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তদন্ত যেন কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের মুখে না পড়ে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কোনো অভিযোগের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত প্রভাব কিংবা সামাজিক অবস্থানের বিষয় জড়িয়ে থাকলে তদন্তের গুরুত্ব আরও বাড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হবে অভিযোগের প্রতিটি দিক যাচাই করে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য বা অতিরঞ্জিত প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকারও রক্ষা করতে হবে।
মাদকবিরোধী লড়াই হতে হবে তথ্য ও আইনের ভিত্তিতেমাদকের বিস্তার রোধে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, বিক্রির নেটওয়ার্ক, অর্থের লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের তথ্য যাচাই করে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মাদকসংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, হামলা বা হয়রানির অভিযোগ পাওয়া গেলে সেগুলোরও যথাযথ তদন্ত করতে হবে। সাংবাদিকের পরিচয় বা পেশার কারণে যেমন কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখা যাবে না, তেমনি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেই তাঁকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করাও সমীচীন নয়।
সত্য উদ্ঘাটনই হোক প্রশাসনের অগ্রাধিকারসলঙ্গার ঘটনা শুধু একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়ও জড়িত।
অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগের কোনো অংশ মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত হলে সেটিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ ন্যায়বিচারের মূল শর্ত হলো—অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
আজ একজন সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে অন্য সংবাদকর্মীরাও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারেন। তাই এ ঘটনায় প্রশাসনের দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ প্রত্যাশিত।
সাংবাদিকের কলমকে ভয় দেখিয়ে থামানোর কোনো সুযোগ নেই; আবার কোনো অভিযোগের বিচারও আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে হতে পারে না। সলঙ্গার ঘটনায় প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটিত হোক, নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হোক এবং অপরাধে জড়িত কেউ আইনের আওতার বাইরে না থাকুক—এটাই প্রত্যাশা। সাংবাদিকের নিরাপত্তা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাই হোক প্রশাসনের অগ্রাধিকার।

মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক