মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ চাই; মো. জাকির হোসাইন
মাদক এখন আর নিছক সামাজিক সমস্যা নয়—এটি জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গভীর হুমকি। অথচ মাদকের বিস্তার ঠেকাতে রাষ্ট্রের বিপুল প্রশাসনিক সক্ষমতা ও আইনগত ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বহু এলাকায় এর সহজলভ্যতা নিয়ে অভিযোগ কমছে না। এই বাস্তবতা প্রশাসনের জন্য নিছক উদ্বেগের বিষয় নয়; এটি কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার সরাসরি সংকেত।
প্রশ্ন হলো—মাদক যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে এত সহজে এর বিস্তার ঘটে কীভাবে? কোথা থেকে আসে? কারা সরবরাহ করে? কারা বিক্রি করে? কারা এর অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী? আর স্থানীয় পর্যায়ে মাদকের বিস্তার সম্পর্কে প্রশাসনের কাছে তথ্য থাকলে ব্যবস্থা নিতে দেরি হয় কেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণ জানতে চায়।
মাদকবিরোধী অভিযান কেবল কয়েকজন খুচরা বিক্রেতাকে আটক করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এতে মূল নেটওয়ার্ক অক্ষত থেকে যায় এবং কিছুদিন পর একই ব্যবসা নতুন মুখে আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়। তাই প্রয়োজন শিকড়ভিত্তিক অভিযান—সরবরাহের উৎস, পরিবহনপথ, অর্থের লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।
আর এখানেই প্রশাসনের কঠোরতা ও সক্ষমতার প্রকৃত পরীক্ষা।
মাদকবিরোধী অভিযান যেন লোক দেখানো কর্মসূচিতে পরিণত না হয়। কোনো এলাকায় নিয়মিত অভিযোগ ওঠার পরও যদি কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে প্রশাসনিক তৎপরতার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নিতে হবে; অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্ত করে তা স্পষ্ট করতে হবে। কিন্তু নীরবতা কোনো সমাধান নয়।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—আইনের প্রয়োগে কোনো ধরনের প্রভাব, পরিচয় বা চাপ যেন বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। মাদক ব্যবসায়ী কে—সেটি নয়; সে অপরাধ করেছে কি না, সেটিই হবে আইনি ব্যবস্থার মূল প্রশ্ন। প্রভাবশালী হোক বা অপ্রভাবশালী—প্রমাণের ভিত্তিতে প্রত্যেক অপরাধীর বিরুদ্ধে একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।
তবে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের অর্থ নির্বিচার হয়রানি নয়। আইন প্রয়োগ হতে হবে প্রমাণনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। প্রকৃত অপরাধীকে ছাড় দেওয়া যেমন চলবে না, তেমনি নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে। কারণ একজন তরুণের মাদকাসক্তি শুধু তার নিজের জীবনকে বিপন্ন করে না; এর অভিঘাত পড়ে পরিবারে, শিক্ষায়, কর্মজীবনে এবং বৃহত্তর সমাজে। মাদকের সঙ্গে কিশোর অপরাধের যোগসূত্র তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
তাই প্রশাসনকে শুধু অভিযান চালালেই হবে না; প্রতিরোধ ও পুনর্বাসন—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা এবং নজরদারি জোরদার করতে হবে।
প্রশাসনের প্রতি কয়েকটি স্পষ্ট দাবি
১. মাদকপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত ও গোয়েন্দাভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
২. শুধু খুচরা বিক্রেতা নয়, সরবরাহকারী ও নেটওয়ার্কের মূল ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে।
৩. মাদক ব্যবসার সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনের সম্পর্ক থাকলে আইন অনুযায়ী তা অনুসন্ধান করতে হবে।
৪. কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক প্রভাব যাতে আইন প্রয়োগে বাধা না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫. অভিযান ও মামলার নামে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
৬. মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।
৭. স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে।
সবশেষে বলতে হয়, মাদকবিরোধী লড়াইয়ে প্রশাসনের সাফল্য কেবল কতজন গ্রেপ্তার হলো—এই পরিসংখ্যানে মাপা যাবে না। দেখতে হবে মাদকের সরবরাহ কমেছে কি না, তরুণদের কাছে এর সহজলভ্যতা কমেছে কি না, এবং মাদকনির্ভর অপরাধের পরিবেশ কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
এখন আর আশ্বাসের সময় নয়। প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। প্রয়োজন ধারাবাহিক অভিযান। প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। প্রয়োজন প্রশাসনিক জবাবদিহি।
একটি প্রজন্মকে মাদকের অন্ধকার থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সেই দায়িত্ব পালনে কোনো শৈথিল্য, গাফিলতি কিংবা আপসের সুযোগ নেই। মাদকের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে এখনই আরও কঠোর, সক্রিয় ও জবাবদিহিমূলক ভূমিকা নিতে হবে।
কারণ মাদকের বিরুদ্ধে আজকের নিষ্ক্রিয়তা—আগামী দিনের আরও বড় সামাজিক বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।

মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক