জ্বালানি সংকটে বাড়ছে জনভোগান্তি, চাই কঠোর নজরদারি

  • মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৮ দুপুর
  • ১০৫৪১ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg


জ্বালানি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ তেল ও গ্যাসের সংকট, সরবরাহে অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষকে বারবার চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। জ্বালানি সংকট এখন শুধু তেল-গ্যাসের বাজারের সমস্যা নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জাতীয় অর্থনীতিতে।

জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে প্রথমেই পরিবহন খাতে এর প্রভাব পড়ে। জ্বালানির দাম ও প্রাপ্যতা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পণ্য পরিবহনেও। ফলে কৃষিপণ্য, কাঁচামাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা ভোক্তার ওপর পড়ে।

কৃষিখাতেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থায় জ্বালানির দাম বা সরবরাহে সমস্যা হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। সেচের খরচ বাড়লে ধান, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষক ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হন।

শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও গ্যাস সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। গ্যাসের চাপ কমে গেলে বা সরবরাহ ব্যাহত হলে গ্যাসনির্ভর কারখানায় উৎপাদন কমে যেতে পারে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়, ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। এতে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, ব্যবসার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

গৃহস্থালি পর্যায়েও সংকটের ভোগান্তি কম নয়। রান্নার গ্যাসের সরবরাহে সমস্যা হলে পরিবারগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়, যা সময় ও ব্যয়—দুই-ই বাড়ায়। অন্যদিকে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জ্বালানি সংকটের আরেকটি বড় প্রভাব হলো মূল্যস্ফীতি। পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ—প্রায় প্রতিটি খাতের ব্যয়ের সঙ্গে জ্বালানির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই জ্বালানির দাম বা সরবরাহে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব ধাপে ধাপে খাদ্য, পোশাক, নির্মাণসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ জ্বালানি সংকট শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

নীতিনির্ধারকদের করণীয় কী

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু সংকটের সময় তৎপরতা নয়, আগাম পরিকল্পনা ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা জরুরি। নীতিনির্ধারকদের কয়েকটি বিষয়ে অবিলম্বে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

প্রথমত, সরবরাহ পরিস্থিতির দৈনিক নজরদারি করতে হবে। দেশের কোন অঞ্চলে কত তেল ও গ্যাসের চাহিদা, কত সরবরাহ হচ্ছে এবং কোথায় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে—এ বিষয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করতে হবে। সংকট দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে ঘাটতির পূর্বাভাস অনুযায়ী আগেই সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে হবে। আমদানি থেকে শুরু করে ডিপো, পরিবেশক ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহের হিসাব ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। কোথায় কত জ্বালানি যাচ্ছে এবং কোথায় অস্বাভাবিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে—তা দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

তৃতীয়ত, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে বিক্রি, অবৈধ মজুত কিংবা সরবরাহ আটকে রেখে বাজারে সংকট তৈরির অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু জরিমানা নয়, পুনরাবৃত্তি হলে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

চতুর্থত, মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারে কীভাবে দাম সমন্বয় করা হচ্ছে এবং কমলে তার সুফল ভোক্তা কতটা পাচ্ছেন—এ বিষয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে। এতে গুজব, অতিরিক্ত মুনাফা ও বাজারে অস্থিরতা কমবে।

পঞ্চমত, শিল্প ও কৃষির জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক সরবরাহ পরিকল্পনা করতে হবে। জ্বালানি সংকটের সময় কোন খাতে কতটা সরবরাহ জরুরি, তার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে সেচ মৌসুমে কৃষকের ডিজেল সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্পে গ্যাস সরবরাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে।

ষষ্ঠত, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সাধারণ মানুষ কোথায় জ্বালানি পাচ্ছেন না, কোথায় বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কিংবা কোথায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে—তা সহজে জানাতে পারবেন এমন হটলাইন ও অনলাইন ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও প্রকাশ করা উচিত।

সপ্তমত, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, বিদ্যমান ক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি অবকাঠামোর আধুনিকায়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।

অষ্টমত, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের পাশাপাশি শিল্প ও পরিবহন খাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। এতে ভবিষ্যতে তেল-গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জ্বালানি খাতকে কেবল বাণিজ্যিক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বিদ্যুৎ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

সরকারের দায়িত্ব শুধু জ্বালানি আমদানি বা সরবরাহ নিশ্চিত করা নয়; সঠিক সময়ে সঠিক দামে সাধারণ মানুষের কাছে তা পৌঁছানোও নিশ্চিত করা। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, কঠোর বাজার তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে তেল-গ্যাস নিয়ে মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এখন প্রয়োজন কথার নয়, দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপের।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad