গুজবই এখন রাজনীতির বড় শত্রু ; শাহীন রাজা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৯ দুপুর
  • ৩৪৫৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠেছে গুজব ও অপতথ্য। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভুয়া কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে যেকোনো ঘটনা দ্রুত রাজনৈতিক উত্তেজনার রূপ নিতে পারে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ও রাজনৈতিক দল—উভয় পক্ষকেই সতর্কতার সঙ্গে পথ চলতে হবে।

রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, বিরোধিতা থাকবে। কিন্তু একটি নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করা কিংবা দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির কোনো প্রচেষ্টা জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতীতের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান বাস্তবতায় দায়িত্বশীল আচরণ করাই জরুরি।

সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে কঠোর অবস্থানের বার্তা পাওয়া গেছে। রাড্ডা হাসপাতাল-সংক্রান্ত ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের পদত্যাগ, ঢাকা মহানগর বিএনপি উত্তরের কমিটি ভেঙে দেওয়া এবং বাংলা মোটরের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের বিষয়গুলো সরকারের অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে বলে মনে করেন লেখক। তাঁর মতে, দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই আইনের শাসনের মূল কথা।

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনগত পদক্ষেপ নিয়েও লেখক প্রশ্ন ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, বিমানবন্দর একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্থাপনা। সেখানে নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন বা অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডের সুযোগ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও নজরদারি আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।

লেখক আরও উল্লেখ করেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও ভাঙচুরের ঘটনাকে ঘিরেও দ্রুত রাজনৈতিক অভিযোগ উঠেছিল। পরে ঘটনাটির পেছনে ভিন্ন কারণের কথা সামনে আসে। তাঁর মতে, কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে যাচাই না করে রাজনৈতিক দলের ওপর দায় চাপানো হলে তা জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে এবং গুজবকে আরও শক্তিশালী করে।

তবে অপরাধের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কেউ জড়িত থাকলে তাকেও ছাড় দেওয়া যাবে না বলে মত দিয়েছেন লেখক। তাঁর ভাষায়, দেশের বিভিন্ন হাটবাজার, মহাসড়ক ও বিভিন্ন সংগঠনের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকলে দল-মত নির্বিশেষে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে। চাঁদাবাজের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় হতে পারে না; তার পরিচয় অপরাধী হিসেবে।

লেখক মনে করেন, অতীতের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত অনেক ব্যক্তি এখন মানবাধিকার ও মানবতার কথা বলছেন। কিন্তু তাঁদের কেউ কেউ অতীতে নিখোঁজ, গুম, নির্যাতন কিংবা রাজনৈতিক নিপীড়নের ঘটনায় নীরব ছিলেন—এমন অভিযোগও তিনি তুলেছেন। তাঁর মতে, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে অবস্থান হওয়া উচিত সর্বজনীন এবং দলনিরপেক্ষ।

একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব হলো অন্যায়কে অন্যায় এবং সঠিককে সঠিক বলা। দলীয় আনুগত্যের কারণে সত্যকে আড়াল করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন লেখক।

এআই-নির্ভর গুজবের নতুন ঝুঁকি

তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে রাজনৈতিক গুজব ছড়ানোর ধরনও বদলে গেছে। বিশেষ করে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া ভিডিও, অডিও ও বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্ট রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরির নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বলে লেখকের পর্যবেক্ষণ।

আগে গুজব ছড়াত মুখে মুখে, লিফলেট কিংবা চায়ের আড্ডায়। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমের কারণে একটি মিথ্যা তথ্য মুহূর্তেই বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কণ্ঠস্বর নকল, ভুয়া ফোনালাপ তৈরি কিংবা কোনো ব্যক্তির বক্তব্য বিকৃত করে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব প্রযুক্তি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি ও উত্তেজনা বাড়াতে ব্যবহৃত হলে তা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

তাই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুজব ও কৃত্রিমভাবে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রকাশ্য, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো অভিযোগ সামনে এলে তা যাচাই না করে প্রচার না করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের ওপর আস্থা রাখা জরুরি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, মতের ভিন্নতা থাকবে। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে না দেয়, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও। সত্য, তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে রাজনীতি পরিচালিত হলে গুজবের প্রভাব কমানো সম্ভব।

দেশের মানুষের প্রত্যাশা একটি শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সেই লক্ষ্য অর্জনে গুজব, অপতথ্য, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক সহিংসতার বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। বাস্তবতার আলোকে এবং সত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়াই হতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad