ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকসের (ইউআইএস) ২০২৪ সালের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় মোট গ্রস অংশগ্রহণের হার প্রায় ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ২০ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নারীশিক্ষায় অগ্রগতি হলেও উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ ও সেখানে টিকে থাকার ক্ষেত্রে এখনো ব্যবধান রয়েছে।
উচ্চশিক্ষার পথে আর্থিক বাধাউচ্চশিক্ষার ব্যয় শুধু ভর্তি ও টিউশন ফির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আবাসন, যাতায়াত, খাবার, বই, ইন্টারনেট, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের ব্যয়ও শিক্ষার্থীদের বহন করতে হয়। নিম্নআয় ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে এ ব্যয় অনেক সময় উচ্চশিক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
নিবন্ধে বলা হয়েছে, কিছু পরিবারে ছেলের উচ্চশিক্ষাকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হলেও মেয়ের ক্ষেত্রে বিয়ে ও পারিবারিক দায়িত্বের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। ফলে মেধা ও আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেক নারী উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়েন।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বাল্যবিয়ের প্রভাব। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে হয়েছে। ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই।
বাল্যবিয়ের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের প্রস্তুতি, বিষয় নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে পরিকল্পনার বয়সেই অনেক তরুণী সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বে আটকে পড়েন। বিয়ের পর পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও সন্তান, পরিবার ও সামাজিক প্রত্যাশার কারণে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
নিরাপদ পরিবেশ বড় চ্যালেঞ্জউচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও হয়রানিমুক্ত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। একজন নারী শিক্ষার্থীর শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। লাইব্রেরি, গবেষণাগার, সেমিনার, গ্রুপ অ্যাসাইনমেন্ট, ইন্টার্নশিপ ও সহশিক্ষা কার্যক্রমেও তাদের অংশ নিতে হয়।
কিন্তু সন্ধ্যার পর নিরাপদে হল বা বাসায় ফেরার নিশ্চয়তা না থাকলে এসব কার্যক্রমে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। নিরাপদ যাতায়াত, পর্যাপ্ত আবাসন, পড়াশোনার উপযোগী জায়গা এবং কার্যকর অভিযোগ ও প্রতিকারব্যবস্থার ঘাটতিও উচ্চশিক্ষায় নারীদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে।
ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানি, আপত্তিকর মন্তব্য, সাইবার হয়রানি, স্টকিং এবং ক্ষমতার অপব্যবহারও উদ্বেগের বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি পরিচিতজন বা সহপাঠীদের মাধ্যমেও হয়রানির শিকার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে মফস্বলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিরাপদ চলাচল ও পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ রয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে অনীহা কাটাতে হবেসামাজিক অপবাদ, ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা, পরিচয় প্রকাশের ভয় এবং কর্তৃপক্ষের প্রতি আস্থার অভাবে অনেক শিক্ষার্থী হয়রানির অভিযোগ করেন না—এমন পরিস্থিতির কথাও নিবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে।
২০০৯ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ হাইকোর্ট যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একাধিক নির্দেশনা দেন। এসব নির্দেশনায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা, সচেতনতা তৈরি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কমিটি গঠনের কথা বলা হয়।
আদালতের নির্দেশনায় যৌন হয়রানির মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক আচরণ, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা অঙ্গভঙ্গি, স্টকিং, অশালীন আচরণ, যৌন সুবিধা দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হয়রানিমূলক বার্তা বা ছবি ব্যবহারের মতো বিভিন্ন আচরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নারীশিক্ষায় নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজননিবন্ধে নারীশিক্ষার বিস্তারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের মতে, সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, উপবৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ ও বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কর্মসূচি নারীশিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রেখেছে। তবে এসব রাজনৈতিক মূল্যায়ন লেখকের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।
বর্তমান পর্যায়ে নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা বাড়ানো যথেষ্ট নয়। কোন বিষয়ে নারীদের অংশগ্রহণ কতটা, কতজন শিক্ষা শেষ করতে পারছেন, গবেষণা ও প্রযুক্তিতে তাঁদের অংশগ্রহণ কতটা এবং উচ্চশিক্ষা শেষে কতজন কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন—এসব সূচকও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি, ইভটিজিং, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নিরাপত্তাহীনতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, নিরাপদ যাতায়াত, পর্যাপ্ত আবাসন এবং নারী শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে উচ্চশিক্ষায় তাঁদের অংশগ্রহণ ও ধারাবাহিকতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
নারীশিক্ষা কেবল শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত। তাই উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের জন্য নিরাপদ, সমতাভিত্তিক ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তথ্যসূত্র: ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকস (UIS), বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (MICS) ২০২৫—বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও ইউনিসেফ, এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের ২০০৯ সালের যৌন হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত নির্দেশনা।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক