জ্বালানি সংকটেও বাড়ছে আমদানি-রপ্তানি, রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ থাকলেও দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও রাজস্ব আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। বন্দরে পণ্য আসা-যাওয়া, কাস্টমসের রাজস্ব আদায় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূচকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিদেশি অর্ডারও বাড়ছে।

ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা বলে সরকারের কাছে বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা দাবি করছেন। তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের কেউ কেউ বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট থাকলেও পরিস্থিতি যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, বাস্তবতা ততটা সংকটপূর্ণ নয়। দিনের পিক আওয়ারে গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকলেও রাতে অফ-পিক সময়ে পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকে। ফলে অনেক গ্যাসনির্ভর কারখানা দিনে উৎপাদন কমিয়ে বা বন্ধ রেখে রাতে পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হচ্ছে।

এভাবে সংকট মোকাবিলা করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টার মধ্যেই আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

আগস্টে কাস্টমসের রাজস্বে ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি

দেশের সবচেয়ে বড় একক রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১২ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছে ১৪ হাজার ১৮ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরের জুলাইয়ে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৭ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা এবং আগস্টে ৫ হাজার ৪৮৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে আদায় কিছুটা কমে ৬ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা হলেও আগস্টে রেকর্ড ৭ হাজার ৯২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। ফলে জুলাইয়ে রাজস্ব আদায়ে ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও আগস্টে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মুখপাত্র সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, মূলত আমদানি বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করেই কাস্টমসের রাজস্ব আদায় হয়। অর্থবছরের প্রথম মাসে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও দ্বিতীয় মাসে আমদানি বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এটি স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি ও জাতীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধিরও একটি সূচক। তৃতীয় মাসেও প্রবৃদ্ধির ধারা ভালো রয়েছে।

বন্দরে বেড়েছে কনটেইনার হ্যান্ডলিং

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ আসা-যাওয়া, কনটেইনার ও খোলা পণ্য হ্যান্ডলিংয়েও মোটামুটি ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে।

২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টে চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল ৫ লাখ ৪৯ হাজার টিইইউ। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৪ হাজার টিইইউ। অর্থাৎ এক বছরে বেড়েছে ৩৪ হাজার টিইইউ।

একই সময়ে বন্দরের জলসীমায় জাহাজ এসেছে ৬৮৪টি। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৬৭৪টি। অর্থাৎ জাহাজ আসা বেড়েছে ১০টি।

তবে খোলা পণ্য হ্যান্ডলিং সামান্য কমেছে। ২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টে ২ কোটি ১৫ লাখ ৪৫ হাজার টন খোলা পণ্য হ্যান্ডলিং হলেও চলতি বছরের একই সময়ে হয়েছে ২ কোটি ১৪ লাখ ৫২ হাজার টন।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামীম বলেন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সহজ করতে বন্দর সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় রয়েছে। আমদানি-রপ্তানিকারকদের হয়রানি এড়াতে বন্দর কর্তৃপক্ষ সচেতন। কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসাবান্ধব কার্যক্রমের কারণে বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বেড়েছে রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং

৬৫ ক্যাটাগরির আমদানিপণ্যের পাশাপাশি শতভাগ রপ্তানিপণ্য হ্যান্ডলিং করে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো বা অফডক কর্তৃপক্ষ।

অফডক মালিকদের সংগঠন বিকডার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সব অফডক মিলে রপ্তানি পণ্যবোঝাই ৮১ হাজার ১৩৫টি কনটেইনার জাহাজীকরণ করে। একই সময়ে আমদানি পণ্যবোঝাই ২৫ হাজার ৬১৩টি কনটেইনার আমদানিকারকের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়।

আগস্টে রপ্তানি পণ্যবোঝাই ৮০ হাজার ৯৪০টি এবং আমদানি পণ্যবোঝাই ৩২ হাজার ৬২৮টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে বিকডা ৮৪ হাজার ৪৭৮টি রপ্তানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার জাহাজীকরণ করে। একই সময়ে ২৮ হাজার ৭১৩টি আমদানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। আগস্টে রপ্তানি পণ্যবোঝাই ৭৯ হাজার ৯৪টি এবং আমদানি পণ্যবোঝাই ২৬ হাজার ১৩২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে অফডক কর্তৃপক্ষ।

সব মিলিয়ে দুই মাসে রপ্তানি কনটেইনার হ্যান্ডলিং বেড়েছে ৪ দশমিক ০১ শতাংশ।

বিকডার সেক্রেটারি রুহুল আমিন শিকদার বলেন, গ্যাস সংকট শুরু হওয়ার পর ব্যবসায়ীদের মধ্যে হা-হুতাশ বেড়েছে। কিন্তু আমদানি-রপ্তানির পরিসংখ্যানের সঙ্গে ওই চিত্র পুরোপুরি মেলে না। অর্ধেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে রপ্তানি ও আমদানিতেও বড় ধরনের পতন দেখা যেত। বাস্তবে তা হয়নি। তবে গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫.১২ শতাংশ

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ থেকে ৭৪৯ কোটি ৫৬ লাখ ১০ হাজার ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ৭১৩ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। এক বছরের ব্যবধানে পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ।

তৈরি পোশাক খাতে সামনে আরও অর্ডার বাড়ার প্রত্যাশা করছেন উদ্যোক্তারা। বিজিএমইএর পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে সামার, উইন্টার ও স্প্রিং—এই তিন সিজনে পোশাকের চাহিদা থাকে। আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা স্প্রিং সিজনটি সবচেয়ে বড়। এ সময়ে ব্ল্যাক ফ্রাইডে, ক্রিসমাস ও নিউ ইয়ারের মতো বড় উৎসব থাকায় অর্ডারও বাড়ে। এ বছরও প্রতিদিন নতুন অর্ডার আসছে।

তবে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে কারখানাগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, শিফট পরিবর্তন ও ছুটি সমন্বয়ের মাধ্যমে উৎপাদন সচল রাখা হচ্ছে। কারখানাগুলো পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে চললে আরও বেশি অর্ডার নেওয়া সম্ভব হতো।

বাড়তি ব্যয়ে উৎপাদন সচল

ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরামের চেয়ারম্যান এসএম আবু তৈয়ব বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন কমেছে, আবার কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। তারপরও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ ধরে রাখতে শিল্প মালিকরা চেষ্টা করছেন। তবে এতে খরচ অন্তত চারগুণ বেড়েছে।

তিনি বলেন, স্প্রিং সিজনে নতুন অর্ডার আসছে। তবে এসব অর্ডার সময়মতো শিপমেন্ট করা যাবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জ্বালানি সংকট পুরোপুরি কাটিয়ে শিল্পকারখানাগুলোকে পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে পারলে আমদানি-রপ্তানি আরও বাড়বে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad