পাঠাভ্যাসের মৃত্যু হলে টিকবে না গণতন্ত্র, কমবে গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা

  • মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)
  • আপলোড সময় : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:২৮ দুপুর
  • ২০৮২৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg এআই দ্বারা নির্মিত ছবি ।
পড়ার অভ্যাসের অবনতি শুধু শিক্ষা বা সংস্কৃতির সংকট নয়, গণতন্ত্রের জন্যও অস্তিত্বের হুমকি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক নয়া নয়া আন্দোলনের উত্থানের দিকে তাকালে বোঝা যায়, সমাজের বড় অংশ যদি দীর্ঘ লেখা, ইতিহাস ও বিশ্লেষণধর্মী তথ্য গ্রহণের সক্ষমতা হারায়, তাহলে গণতান্ত্রিক রাজনীতি আরো দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

মানুষের পড়ার অভ্যাসের নেতিবাচক পরিবর্তন খুবই উদ্বেগের। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বই ও দীর্ঘ লেখা পড়ার প্রবণতা কমছে। এর বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুতগতির, ছোট ও আবেগনির্ভর কনটেন্ট মানুষের মনোযোগের ধরন বদলে দিচ্ছে। ফলে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যের পেছনের ইতিহাস, প্রেক্ষাপট বা যুক্তি যাচাই করার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রবণতা বাড়ছে।

লেখক জেমস ম্যারিয়টের ‘দ্য নিউ ডার্ক এজেস’ বইটির উপশিরোনাম ‘দ্য এন্ড অব রিডিং অ্যান্ড দ্য ডন অব আ পোস্ট-লিটারেট সোসাইটি’। ম্যারিয়টের যুক্তিকে সামনে রাখলে দেখা যায়, সমাজ যখন গভীর পাঠ থেকে সরে গিয়ে ক্রমাগত ছোট, দ্রুত এবং আবেগনির্ভর তথ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন জটিল বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতাও সংকুচিত হয়।

এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস ও রাজনীতির দীর্ঘ প্রেক্ষাপট না জানলে মানুষ সহজেই এমন রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রভাবের মধ্যে পড়ে যেতে পারে, যা বাস্তবতার জটিলতাকে সরল করে উপস্থাপন করে। আবেগ, ক্ষোভ, ভয় কিংবা তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি রাজনৈতিক বার্তা তখন যুক্তি ও বিশ্লেষণের চেয়ে বেশি কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।

এই প্রসঙ্গে যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক ফ্যাসিবাদী বিক্ষোভ বুঝাটাও গুরুত্বপূর্ণ। এমন রাজনৈতিক আন্দোলনের বিপদ সম্পর্কে মানুষ কতটা সচেতন, যদি তারা ইতিহাসের ফ্যাসিবাদী অধ্যায়গুলো সম্পর্কে পড়াশোনা না করে থাকে? ইতিহাস ও রাজনৈতিক চিন্তার সঙ্গে মানুষের সংযোগ দুর্বল হলে অতীতের বিপজ্জনক মতাদর্শ নতুন ভাষা ও নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে ফিরে এলেও তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে।

একই ধরনের প্রবণতা মার্কিন রাজনীতিতেও দেখা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো জনপ্রিয়তাবাদী রাজনীতিকদের উত্থান বোঝার ক্ষেত্রেও গণমাধ্যমের পরিবর্তিত চরিত্র ও মানুষের মনোযোগের সংকট গুরুত্বপূর্ণ। যখন দীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনার পরিবর্তে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া সংক্ষিপ্ত বার্তা রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন তথ্যের গভীরতা ও সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ কমে যায়।

এটি শুধু বই পড়ার পক্ষে সাংস্কৃতিক আহ্বান নয়। বই পড়া কমলে উদ্বেগ বাড়ে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে। আধুনিক গণতন্ত্র এমন নাগরিকের ওপর নির্ভর করে, যারা তথ্য গ্রহণ করতে পারে, বিভিন্ন মতের তুলনা করতে পারে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ও পরিণতি বিশ্লেষণ করতে পারে। গভীর পাঠের অভ্যাস এই সক্ষমতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সমাজ যদি ধীরে ধীরে ‘পোস্ট-লিটারেট’ বা পাঠ-পরবর্তী এক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিই দুর্বল হবে। মানুষ শুধু কী বলা হচ্ছে তা শুনবে, কিন্তু কেন বলা হচ্ছে, এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কী এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি কী—এসব প্রশ্ন করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।

তাই গণতন্ত্র রক্ষার জন্য শুধু নির্বাচন, সংসদ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন চিন্তাশীল নাগরিক। আর চিন্তাশীল নাগরিক তৈরির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো গভীরভাবে পড়া। বই, ইতিহাস, দীর্ঘ প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণধর্মী লেখা থেকে দূরে সরে গিয়ে যদি সমাজ কেবল দ্রুত ও আবেগনির্ভর কনটেন্টের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে গণতন্ত্র যে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, সেটিই ক্ষয়ে যেতে পারে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad