জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশের শহরগুলো কতটা প্রস্তুত ?

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg এআই দ্বারা নির্মিত ছবি ।
তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে; প্রয়োজন সমন্বিত নগর জলবায়ু পরিকল্পনা

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিশ্বের অন্যতম দেশ। একসময় জলবায়ু পরিবর্তনের আলোচনা মূলত উপকূলীয় এলাকা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা নদীভাঙনকে ঘিরে থাকলেও পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। জলবায়ু সংকট আর শুধু উপকূলের সমস্যা নয়; এটি রাজধানী ঢাকার যানজট, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা, সিলেটের আকস্মিক বন্যা, রাজশাহীর তীব্র তাপপ্রবাহ কিংবা খুলনার লবণাক্ততার মধ্যেও স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।

বাংলাদেশের শহরগুলো এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের প্রথম সারিতে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের শহরগুলো কতটা প্রস্তুত?

তীব্র হচ্ছে নগর তাপপ্রবাহ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। শহরাঞ্চলে কংক্রিটের বিস্তার, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত সবুজ জায়গা কমে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব আরও তীব্র হচ্ছে।

দিনের পাশাপাশি রাতেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা থাকায় শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।

অন্যদিকে কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই বড় শহরগুলোতে জলাবদ্ধতা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল, জলাধার ভরাট এবং পরিকল্পনাহীন নির্মাণকাজের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না। এর ফলে যানজট, ব্যবসায়িক ক্ষতি, শিক্ষা কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং জনদুর্ভোগ বাড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ায় নগর অবকাঠামোকে নতুন এই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।

চরম আবহাওয়া হয়ে উঠছে নতুন বাস্তবতা

এ বছরের বর্ষাতেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ বিভিন্ন জেলায় ভারী বর্ষণে প্রাণহানি, ভূমিধস, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, চরম আবহাওয়া আর বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা নয়; বরং ধীরে ধীরে এটি আমাদের নতুন বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।

জলবায়ু অভিবাসনে বাড়ছে শহরের চাপ

জলবায়ু পরিবর্তনের আরেকটি বড় প্রভাব অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসন। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও নদীভাঙনের কারণে অনেক মানুষ জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন।

জলবায়ুজনিত এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসন শহরগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, নিরাপদ পানি ও কর্মসংস্থানের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও সে অনুযায়ী সেবার পরিধি বাড়ছে না। ফলে বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

পরিবেশগত দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শহরের জলাভূমি ও খোলা জায়গা দ্রুত কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণের সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। একই সঙ্গে গাছপালা কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ুর মানের অবনতিও ঘটছে।

কিছু উদ্যোগ, তবে প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিভিন্ন শহরে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খাল পুনরুদ্ধার, বৃক্ষরোপণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে অবকাঠামো নির্মাণ এবং দুর্যোগের পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ।

তবে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নগর সবুজায়নও গুরুত্বপূর্ণ। একটি শহরে গাছ শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না; এটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, বায়ুর মান উন্নয়ন এবং বৃষ্টির পানি ধারণেও ভূমিকা রাখে।

এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর। বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত নগর জলবায়ু পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি।

জলবায়ু-সহনশীল শহর গড়তে যা জরুরি

বাংলাদেশের শহরগুলোকে জলবায়ু-সহনশীল করে তুলতে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, নগর পরিকল্পনায় জলাভূমি, খাল ও উন্মুক্ত সবুজ স্থান সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, গণপরিবহন ও পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। চতুর্থত, নতুন ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব নকশা ও জ্বালানিসাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

এর পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নাগরিক সম্পৃক্ততা ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আনতে পারবে না।

প্রস্তুতির সময় এখনই

জলবায়ু সংকট আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমানের বাস্তবতা। তাই দুর্যোগ আঘাত হানার পর ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতি, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং জবাবদিহিতামূলক বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের শহরগুলোকে জলবায়ু-সহনশীল করে গড়ে তোলার কাজ আগামী দিনের জন্য ফেলে রাখার সুযোগ নেই। প্রস্তুতি শুরু করতে হবে আজই।

লেখক: শিক্ষার্থী, অর্থনীতি, ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad