একটি জাতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাব্যবস্থার চরিত্র, দর্শন ও উদ্দেশ্যের ওপর। অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি কিংবা সামরিক শক্তি কোনো রাষ্ট্রকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি জাতির সভ্যতা, মানবিকতা, নৈতিকতা ও সৃজনশীল সক্ষমতার ভিত্তি নির্মাণ করে সুপরিকল্পিত ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা। যে জাতি শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধির বিকাশকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিতে পারে, টেকসই উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তার বেশি।
অন্যদিকে শিক্ষার অবক্ষয়, জ্ঞানচর্চার সংকোচন এবং বৌদ্ধিক স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ একটি জাতির পশ্চাৎপদতার পূর্বলক্ষণ হয়ে উঠতে পারে। তাই শিক্ষার সংকটকে কেবল শিক্ষাক্ষেত্রের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি জাতির সামগ্রিক ভবিষ্যতের সংকট। একইভাবে শিক্ষার মুক্তি মানেই জাতির মুক্তির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করা।
শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরির প্রক্রিয়া নয়। এটি মানুষের চিন্তা, বিবেক, বিচারবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও নাগরিক চেতনা গঠনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একটি জাতি কী ধরনের মানুষ তৈরি করতে চায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কোন মূল্যবোধ হস্তান্তর করতে চায়—তার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় শিক্ষানীতি ও তার বাস্তব প্রয়োগে।
শিক্ষা কি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, নাকি ক্ষমতার ক্ষেত্র?বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কি সত্যিই জ্ঞানচর্চা, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে, নাকি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হয়ে উঠছে?
এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা নির্দিষ্ট সময়ের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে শিক্ষা, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার সম্পর্কের একটি গভীর কাঠামোগত বাস্তবতা জড়িত।
শিক্ষা ও রাজনীতির সম্পর্ক অবশ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো থেকে আধুনিক যুগের মার্কিন শিক্ষাবিদ জন ডিউই এবং ব্রাজিলীয় শিক্ষাবিদ পাওলো ফ্রেইরি—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাচিন্তকই শিক্ষা ও নাগরিক জীবনের পারস্পরিক সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।
মানুষ সমাজে বসবাস করে এবং রাষ্ট্রের কাঠামোর মধ্যেই তার জীবন পরিচালিত হয়। ফলে শিক্ষা কখনোই সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির বাইরে থাকতে পারে না। বরং একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের সচেতন, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক দায়িত্ব সম্পর্কে ধারণা দেওয়া।
তবে রাজনৈতিক সচেতনতা ও দলীয় আনুগত্য এক বিষয় নয়।
নাগরিক শিক্ষা মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং যুক্তির ভিত্তিতে মতামত গঠন করতে শেখায়। বিপরীতে দলীয়করণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের অনুগত কাঠামোয় আবদ্ধ করে। সেখানে স্বাধীন চিন্তা ও সমালোচনামূলক বোধের পরিবর্তে আনুগত্য, অনুসরণ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থান গুরুত্ব পেতে থাকে।
এখানেই শিক্ষার সবচেয়ে বড় সংকট।
প্রশ্নহীন শিক্ষা কখনো মুক্তি দিতে পারে নাশিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য মুখস্থ করানো কিংবা সনদ অর্জনের সুযোগ তৈরি করা নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে, সত্য অনুসন্ধানের সাহস অর্জন করতে এবং নিজের বিবেকের সঙ্গে সংলাপ করতে শেখায়। এটি মানুষের মেধার পাশাপাশি নৈতিক বোধ, মানবিকতা ও বিচারক্ষমতারও বিকাশ ঘটায়।
একটি সমাজে শিক্ষার সাফল্য কতজন মানুষ তথ্য জানে, শুধু তা দিয়ে নির্ধারিত হতে পারে না। বরং কতজন মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বুঝতে পারে—সেটিই হওয়া উচিত শিক্ষার বড় মানদণ্ড।
পাওলো ফ্রেইরি তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ পেডাগোজি অব দ্য অপ্রেসড বা অত্যাচারিতের শিক্ষা-এ দেখিয়েছেন, শিক্ষা যদি কেবল তথ্য জমা রাখার যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, তাহলে তা মুক্ত মানুষ নয়, অনুগত মানুষ তৈরি করে। তিনি এ পদ্ধতিকে ‘ব্যাংকিং মডেল অব এডুকেশন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীকে একটি খালি পাত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং শিক্ষক তার মধ্যে তথ্য জমা করেন। ফলে শিক্ষার্থীর চিন্তা, প্রশ্ন, সৃজনশীলতা ও অভিজ্ঞতার গুরুত্ব কমে যায়।
ফ্রেইরির মতে, প্রকৃত শিক্ষা হওয়া উচিত সংলাপভিত্তিক, অংশগ্রহণমূলক ও মুক্তিকামী। এমন শিক্ষা মানুষকে শুধু বিদ্যমান বাস্তবতা বুঝতে সাহায্য করে না; প্রয়োজন হলে সেই বাস্তবতা পরিবর্তনের সক্ষমতাও তৈরি করে।
প্রকৃতপক্ষে প্রশ্ন করার ক্ষমতাই মানবসভ্যতার অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সক্রেটিসের অনুসন্ধিৎসু প্রশ্ন, গ্যালিলিওর বৈজ্ঞানিক কৌতূহল, আইজাক নিউটনের পর্যবেক্ষণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুক্তচিন্তা কিংবা জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণামনস্কতার কেন্দ্রে ছিল প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস।
জ্ঞান কখনো স্থির নয়। অনুসন্ধান, পরীক্ষা, বিতর্ক ও পুনর্মূল্যায়নের মধ্য দিয়েই জ্ঞান বিকশিত হয়। তাই যে শিক্ষাব্যবস্থা প্রশ্ন করাকে নিরুৎসাহিত করে, ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখে কিংবা সমালোচনামূলক চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তা দীর্ঘমেয়াদে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনশক্তিকে দুর্বল করে।
মুখস্থনির্ভর সাফল্য বনাম স্বাধীন চিন্তাবাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হলো অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষাকে জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে আনুগত্যের অনুশীলনে পরিণত করা। শিক্ষার্থীরা কীভাবে পরীক্ষায় ভালো ফল করবে, কীভাবে নির্ধারিত উত্তর পুনরুৎপাদন করবে—সেটি শেখে। কিন্তু কীভাবে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে হবে, নতুন প্রশ্ন তুলতে হবে কিংবা জটিল সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সমস্যার বিশ্লেষণ করতে হবে, তা সবসময় শেখে না।
ফলে অনুসন্ধিৎসু মনের বিকাশের পরিবর্তে মুখস্থনির্ভর সাফল্যের সংস্কৃতি শক্তিশালী হয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা অল্প বয়স থেকেই এমন একটি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়, যেখানে ক্ষমতার প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যকে গুণ হিসেবে দেখা হয়। তারা ক্ষমতাবানকে কীভাবে খুশি রাখতে হয়, তা শিখতে পারে; কিন্তু সত্যের পক্ষে কীভাবে দাঁড়াতে হয়, তা শেখার সুযোগ কমে যায়।
অথচ ইতিহাসের প্রতিটি ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের পেছনে এমন মানুষ ছিলেন, যারা প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার সামনে নত না হয়ে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছেন।
শিক্ষা যদি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা, নৈতিক সাহস ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ ঘটাতে না পারে, তাহলে তা দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারলেও সচেতন নাগরিক তৈরি করতে পারবে না। আর সচেতন, চিন্তাশীল ও নৈতিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিকের ঘাটতি তৈরি হলে দুর্বল হয় গণতন্ত্র, থেমে যায় উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হয় জাতীয় উন্নয়ন।
শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিকীকরণ যে কারণে বিপজ্জনকশিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিকীকরণ কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এর প্রভাব রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যৎ বিকাশের ওপরও পড়ে।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান দায়িত্ব মুক্তবুদ্ধির বিকাশ, জ্ঞানচর্চার প্রসার এবং মানবিক ও দক্ষ নাগরিক তৈরি করা। কিন্তু যখন শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দলীয় প্রভাব বিস্তার কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্র দখলের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন শিক্ষা তার মৌলিক উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হতে থাকে।
এর ফলে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বৌদ্ধিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার নৈতিক ও একাডেমিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে শুরু করে।
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়েরে বুর্দিয়ো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু জ্ঞান বিতরণের স্থান হিসেবে দেখেননি। তিনি বিশ্লেষণ করেছেন, শিক্ষা কীভাবে অনেক সময় বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামোকে পুনরুৎপাদন করতে পারে। তাঁর ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’ ও ‘সামাজিক পুনরুৎপাদন’ তত্ত্ব দেখায়, শিক্ষা সবসময় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করে না; অনেক ক্ষেত্রে সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতা, মর্যাদা ও সুযোগের অসম বণ্টনকে নতুন রূপে টিকিয়ে রাখতে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ বিশ্লেষণ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।
যখন শিক্ষাঙ্গনে দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা গোষ্ঠীগত সংশ্লিষ্টতা মেধা, নৈতিকতা, পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৌদ্ধিক স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে।
নিয়োগ, পদোন্নতি, নেতৃত্ব নির্বাচন, গবেষণার সুযোগ কিংবা একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যদি যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে ধীরে ধীরে একটি অস্বাস্থ্যকর সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এতে মেধাবী ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিরা নিরুৎসাহিত হন এবং আনুগত্যভিত্তিক সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
স্লোগানের জায়গায় যুক্তি, আনুগত্যের বদলে গবেষণাশিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিকীকরণের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় শিক্ষার মূল চরিত্রে। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পরিচয় তখন জ্ঞানচর্চাকারী, গবেষক কিংবা অনুসন্ধিৎসু নাগরিকের পরিবর্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত অবস্থানের প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করে।
একাডেমিক সহযোগিতা ও বৌদ্ধিক বিনিময়ের জায়গা দখল করে নেয় ক্ষমতা ও প্রভাবের সমীকরণ। মতের বৈচিত্র্যকে সম্পদ হিসেবে গ্রহণের পরিবর্তে ভিন্নমতকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। জ্ঞানতাত্ত্বিক বিতর্কও অনেক সময় রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে মূল্যায়িত হয়।
এর পরিণতি হয় বিভক্ত শিক্ষাঙ্গন।
সেখানে প্রশ্নের পরিবর্তে স্লোগান, যুক্তির পরিবর্তে আনুগত্য এবং গবেষণার পরিবর্তে অবস্থানগত পক্ষপাত প্রাধান্য পেতে থাকে। জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়কে সমালোচনামূলকভাবে বিশ্লেষণের পরিবর্তে মানুষ পূর্বনির্ধারিত মতাদর্শিক অবস্থান থেকে বিচার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ কিংবা বিদ্যালয়ের যে উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার পরিবেশ থাকার কথা, তা সংকুচিত হয়। গবেষণাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ নতুন জ্ঞান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন মুক্ত বিতর্ক, ভিন্নমতের সহাবস্থান এবং প্রশ্ন করার স্বাধীনতা।
শিক্ষাকে ফিরতে হবে তার মূল উদ্দেশ্যেইতিহাসের অভিজ্ঞতা দেখায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যখন দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে, তখন জ্ঞানচর্চা দুর্বল হয় এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিপরীতে যেসব সমাজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ক্ষমতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রেখে একাডেমিক, গবেষণা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত করেছে, তারা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে অধিক অগ্রগতি অর্জন করেছে।
কারণ জ্ঞান বিকশিত হয় স্বাধীন পরিবেশে; নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে নয়।
তাই শিক্ষাঙ্গনের রাজনৈতিকীকরণকে কেবল প্রশাসনিক বা সাংগঠনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি জাতির বৌদ্ধিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জাতীয় প্রশ্ন।
আমরা যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জ্ঞান, গবেষণা ও মুক্তবুদ্ধির কেন্দ্রে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে না পারি, তাহলে সনদধারী মানুষের সংখ্যা হয়তো বাড়বে; কিন্তু এমন নাগরিক তৈরি করা কঠিন হবে, যারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে এবং জাতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে সৃজনশীল অবদান রাখতে সক্ষম।
অতএব, শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত ক্ষমতার অনুগত মানুষ তৈরি করা নয়; বরং এমন মানুষ তৈরি করা, যারা সত্য অনুসন্ধান করবে, প্রশ্ন করবে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে এবং যুক্তি ও মানবিকতার ভিত্তিতে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করবে।
শিক্ষা তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন তা মানুষকে কেবল জীবিকার জন্য প্রস্তুত করে না—নিজের চিন্তা, বিবেক ও স্বাধীনতার জন্যও প্রস্তুত করে।
লেখক: ড. মাহরুফ চৌধুরী, ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
শিক্ষা, রাজনীতি ও মুক্তবুদ্ধির সংকট: আলোকিত জাতি গঠনের পূর্বশর্ত—পর্ব ১

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)