‘অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের নগর একীভূতকরণ সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং স্বাগতিক সম্প্রদায়কে সহায়তা প্রদান (ইন্টিগ্রেট)’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয়েছে ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। জার্মান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জিআইজেড) অর্থায়নে ১ বছর ৯ মাস মেয়াদি এই প্রকল্পটির ওপর আজ রোববার পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জের মতো শহরগুলোতে জলবায়ু উদ্বাস্তূদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। এর মাধ্যমে ৩০০ জন ব্যক্তিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায় সহায়তা এবং দেড় হাজার জনের জীবিকা উন্নত করার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত বাজেটের চিত্র বলছে, দরিদ্রদের ভাগ্যের চেয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের পকেট ভরাতেই বরাদ্দের ৮৬.৭৭ শতাংশ ব্যয় হয়ে যাবে।
খরচের খতিয়ান: গরিবের ভাগে মাত্র ১৩.২৩%
মোট ৬১ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বাজেটের এই প্রকল্পে মূল লক্ষ্য অর্জনে ব্যয়ের চেয়ে পরোক্ষ খরচই কয়েকগুণ বেশি। নিচে ব্যয়ের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো:
খাতের নাম
বরাদ্দের পরিমাণ
মোট বাজেটের শতাংশ
প্রকৃত অভাবী মানুষের অনুদান
৮ কোটি ১০ লাখ ৯০ হাজার টাকা
১৩.২৩%
পরামর্শক ব্যয় (৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি)
২৯ কোটি ৬২ লাখ ৬৩ হাজার টাকা
৪৮.৩৩%
ব্যবস্থাপনা চার্জ (জিআইজেড)
১০ কোটি ৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা
১৬.৪৪%
কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ ও প্রশিক্ষণ
৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা
৫.৭৩%
অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ
১ কোটি ২৭ লাখ ৭৬ হাজার টাকা
২.০৮%
অফিস ভবন ভাড়া
৩ কোটি ১৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা
৫.২১%বিস্ময়কর তথ্য: যেখানে ৩ জেলা থেকে মাত্র ৩০০ জন দরিদ্র মানুষকে (২৭০ জন নারী ও ৩০ জন প্রতিবন্ধী) ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য অনুদান দেওয়া হবে, সেখানে তাদের 'পরামর্শ' দেওয়ার জন্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে ৪৭৩ জন দেশি-বিদেশি পরামর্শক!
নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে বিদেশ ভ্রমণের আবদার
সরকারের পক্ষ থেকে কৃচ্ছ্রসাধনের কঠোর নির্দেশনা এবং বৈদেশিক ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এই প্রকল্পে কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণের ‘সাধ’ মেটাতে ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া আইটি সামগ্রী ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অস্বাভাবিক উচ্চমূল্য ধরা হয়েছে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে। বাকি টাকা খরচ হবে প্রশিক্ষণ কর্মশালা, প্রশাসনিক ও ইউটিলিটি বিল, যানবাহন ও জ্বালানি খাতে।
বিধি লঙ্ঘন ও অস্পষ্টতার অভিযোগপ্রকল্পটিতে সুবিধাভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছ রূপরেখা দেওয়া হয়নি। এছাড়া প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ-২০০৬) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণ না করারও অভিযোগ উঠেছে। মেয়াদের একটি বড় অংশ ইতিমধ্যে পার হয়ে যাওয়ায় এর বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কড়া নজরদারিব্যয় কাঠামোর এমন অস্বাভাবিক চিত্র দেখে পিইসি সভায় সমাজসেবা অধিদপ্তরকে কড়া জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের এক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, "প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাদ দিয়ে অন্যান্য খাতে সিংহভাগ খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। পিইসি সভায় এই প্রকল্পের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয়গুলো কাটছাঁট করতে বলা হবে।"
দায় এড়াতে চাইছে সমাজসেবা অধিদপ্তরব্যয়ের এমন অস্বাভাবিকতার বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অধিশাখা) মো. সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, এটি মূলত দাতা সংস্থার পছন্দ বা শর্ত অনুযায়ী তৈরি করা একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প। তিনি বলেন, "যেহেতু এটি অনুদানের টাকা, তাই অনেক ক্ষেত্রে দাতা সংস্থার (জিআইজেড) দেওয়া শর্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এই প্রস্তাবনাটি তারা নিজেরা তৈরি করেননি, দাতা সংস্থাই তৈরি করে পাঠিয়েছে।" বিদেশ ভ্রমণের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, সরকার অনুমতি দিলেই কেবল এই অর্থ খরচ হবে, অন্যথায় টাকা পড়ে থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের দোহাই দিয়ে নেওয়া এই ধরনের প্রকল্প যদি আমলাতান্ত্রিক বিলাসিতায় শেষ হয়ে যায়, তবে তা কেবল সরকারি ও বৈদেশিক অর্থের অপচয় হিসেবেই গণ্য হবে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক