আজ ২৬ জুন—দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীর জন্য এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন দিন। ‘দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা মুক্ত দিবস’ উপলক্ষে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে উদযাপনের পাশাপাশি এখনো তাদের কণ্ঠে একটাই দাবি—১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ-ভারত চুক্তি অনুযায়ী তিন বিঘা করিডোরের পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার বাস্তবায়ন।
লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাবেক ছিটমহল। ভারতের ভূখণ্ডবেষ্টিত এ জনপদের প্রায় ২২ হাজার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মূল ভূখণ্ডে যাতায়াতের জন্য তিন বিঘা করিডোরের ওপর নির্ভরশীল।
১৯৯২ সালের ২৬ জুন তৎকালীন সরকার ভারতের কাছ থেকে ৯৯ বছরের জন্য প্রতীকী বার্ষিক খাজনার বিনিময়ে করিডোরটি ইজারা নেয়। প্রথমদিকে প্রতিদিন মাত্র ১২ ঘণ্টা চলাচলের সুযোগ ছিল। পরে ২০১১ সালের বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির আওতায় করিডোরটি ২৪ ঘণ্টার জন্য উন্মুক্ত করা হলেও এর নিয়ন্ত্রণ এখনো ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের দাবি, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি অনুযায়ী করিডোরটির দৈর্ঘ্য ১৭৮ মিটার এবং প্রস্থ ৮৫ মিটার হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা ব্যবহার করতে পারছেন মাত্র প্রায় ৯ ফুট প্রশস্ত একটি রাস্তা। ফলে বড় যানবাহন চলাচলের সময় একপাশের যানবাহনকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। পাশাপাশি করিডোরজুড়ে বিএসএফের চেকপোস্ট, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, সিসি ক্যামেরা ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে প্রতিনিয়ত নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, করিডোরের দুই পাশে স্থাপিত বিভিন্ন স্থাপনার কারণে রাস্তা আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কোনো যানবাহনের ধাক্কায় ভারতীয় স্থাপনার ক্ষতি হলে বাংলাদেশি চালকদের জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়।
দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক রেজানুর রহমান রেজা বলেন, “দক্ষিণ বেরুবাড়ি বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী ভারতকে হস্তান্তর করলেও বিনিময়ে আমরা তিন বিঘা করিডোরের পূর্ণ অধিকার পাইনি। দীর্ঘ আন্দোলন করেও এখনো চুক্তির বাস্তবায়ন হয়নি। কৃষি ও পশুপালননির্ভর মানুষের স্বাভাবিক চলাচলেও নানা বিধিনিষেধ রয়েছে।”
দহগ্রামের বাসিন্দা আব্বাস আলী বলেন, “আগে সন্ধ্যার পর করিডোর বন্ধ থাকায় অনেক রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হতো না। এখন ২৪ ঘণ্টা চলাচলের সুযোগ মিললেও করিডোরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো বাংলাদেশের হাতে আসেনি।”
আরেক বাসিন্দা মরিয়ম আখতার জানান, “ভারতীয় কোনো ভিআইপি এলে অনেক সময় করিডোরের গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।”
প্রতি বছরের মতো এবারও দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ, র্যালিসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। বক্তারা দ্রুত তিন বিঘা করিডোরের পূর্ণ অধিকার বাস্তবায়নের দাবি জানান।
উল্লেখ্য, ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ বেরুবাড়ি ভারতের কাছে হস্তান্তরের বিনিময়ে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাকে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে স্থায়ীভাবে সংযুক্ত করার কথা ছিল। তবে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।

শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ