৭ নভেম্বর: জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ চাই

  • মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫১ রাত
  • ১২৩৭৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও আলোচিত দিন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত এই দিনটি দেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতার পালাবদল, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাই দিনটি কেবল অতীত স্মরণের উপলক্ষ নয়; বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে টানাপোড়েন, সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এমন এক অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি সংঘটিত হয়। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য, রাজনৈতিক শক্তি এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ দেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতার সূচনা করে। এ দিনের ঘটনা ও তাৎপর্য নিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে ইতিহাসের কোনো ঘটনাকে কেবল দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। ইতিহাসের যথাযথ বিশ্লেষণে আবেগের পাশাপাশি সত্য, তথ্য ও বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাস বিকৃত করা কিংবা অতীতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিভাজন সৃষ্টি করা জাতির জন্য কখনোই কল্যাণকর হতে পারে না।

৭ নভেম্বরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—জাতীয় সংকটে ঐক্য ও সংহতির প্রয়োজনীয়তা। তবে সংহতি মানে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা নয়; এর প্রকৃত অর্থ হলো দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ও অঙ্গীকার।

বর্তমান বাংলাদেশে এই চেতনার প্রয়োজন আরও বেশি। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, আদর্শের ভিন্নতা থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু মতের অমিল যেন সংঘাত, প্রতিহিংসা, দমন-পীড়ন কিংবা সহিংসতার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের মতামতের প্রতিফলন, অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমাদের প্রত্যাশা, ক্ষমতার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি দমন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে হবে। সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ এবং ভিন্নমতের মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করাও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।

একই সঙ্গে অতীতের রাজনৈতিক ভুল, সংঘাত ও সহিংসতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি। ইতিহাসের সত্য আড়াল করে কোনো জাতি টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে পারে না। নতুন প্রজন্মের সামনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তথ্যনির্ভর, বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরতে হবে। এতে ইতিহাস সম্পর্কে তাদের সঠিক ধারণা তৈরি হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে।

প্রথম দর্পণ মনে করে, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিকতা কিংবা রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এই দিন হোক জাতীয় ঐক্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার নতুন অঙ্গীকারের দিন।

দেশ কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। দেশ সবার, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। তাই দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিভাজন নয়—ঐক্য; প্রতিহিংসা নয়—ন্যায়বিচার; ক্ষমতার দাপট নয়—জনগণের অধিকার; স্বেচ্ছাচারিতা নয়—আইনের শাসন—এটাই হওয়া উচিত আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের প্রকৃত প্রত্যয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও দায়িত্বশীল আচরণের চর্চা প্রতিষ্ঠিত হোক। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থ ও অধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাক।

জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় হোক, গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পাক, প্রতিষ্ঠিত হোক আইনের শাসন। জনগণের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠুক একটি সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad