মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়তে চাই কার্যকর পদক্ষেপ

  • মোঃ জাকির হোসাইন,সম্পাদক
  • আপলোড সময় : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৮ দুপুর
  • ৫৩৮৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg

মাদক একটি ব্যক্তি বা পরিবারের সমস্যা নয়; এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। একটি সম্ভাবনাময় তরুণ জীবনকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে মাদকাসক্তি। এর প্রভাব পড়ে পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন ও সামাজিক নিরাপত্তায়। তাই মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু স্লোগান নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ, দৃঢ় অঙ্গীকার এবং সমন্বিত উদ্যোগ।

মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান গুরুত্বপূর্ণ। তবে মাদক নির্মূলের নামে কেবল মাদকসেবীদের গ্রেপ্তার করে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, চোরাচালান এবং অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। মাদক ব্যবসার নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিরা যেন কোনো প্রভাব, পরিচয় কিংবা অর্থের জোরে ছাড় না পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখা জরুরি।

মাদক প্রতিরোধে পরিবারকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তাদের মানসিক চাপ, হতাশা ও সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা প্রয়োজন। পারিবারিক অবহেলা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমিয়ে তরুণদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি আলোচনা, পরামর্শ, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, কারিগরি প্রশিক্ষণ, সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানো গেলে তাদের সুস্থ ও ইতিবাচক কাজে যুক্ত রাখা সহজ হবে।

অন্যদিকে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু ঘৃণা বা অবজ্ঞার চোখে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। আসক্তি থেকে মুক্ত হতে অনেকের প্রয়োজন চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসন। তাই সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা, নির্ভরযোগ্য পরামর্শ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের প্রতি মানবিক আচরণও জরুরি।

স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মাদক কেনাবেচার নির্ভরযোগ্য তথ্য পেলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে—শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা দিয়ে নয়, মাদকের সহজলভ্যতা কমছে কি না, আসক্তির হার হ্রাস পাচ্ছে কি না এবং কতজন চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফিরছেন, তা দিয়েও।

মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়ে তোলা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। আইন প্রয়োগ, সচেতনতা, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন—সব ক্ষেত্রেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকতে হবে, আর প্রতিটি উদ্যোগের কেন্দ্রে রাখতে হবে মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ।

আজকের তরুণরাই আগামী দিনের রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি। তাদের মাদকের অন্ধকার থেকে রক্ষা করতে পারলে নিরাপদ সমাজ, সুস্থ পরিবার ও সমৃদ্ধ দেশ গড়ার পথ আরও সুগম হবে। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণের আনুষ্ঠানিকতা নয়, চাই বাস্তব ফলাফল; বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, চাই ধারাবাহিক ও সমন্বিত কার্যক্রম। মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়তে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

এখনই চাই কার্যকর কর্মপরিকল্পনা

মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়তে হলে প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে দৃশ্যমান কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য প্রথমত, মাদকপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাদকের মূল সরবরাহকারী, চোরাচালানকারী ও অর্থের জোগানদাতাদের শনাক্ত করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় পর্যায়ে মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। চতুর্থত, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের জন্য সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, তরুণদের খেলাধুলা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তারা ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে পারে।

পাশাপাশি প্রতিটি কর্মসূচির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। প্রতি তিন মাস অন্তর মাদকবিরোধী কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে সাফল্য, ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগসাজশের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং অভিযোগকারীর পরিচয় সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে।

এখন প্রয়োজন পাঁচটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি—মাদকের সরবরাহ বন্ধ, অবৈধ ব্যবসার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া, তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি প্রতিরোধ, আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার ও নাগরিক সমাজকে নিজ নিজ দায়িত্ব নির্ধারণ করে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। মাদকবিরোধী কার্যক্রমের সাফল্য শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারের সংখ্যায় নয়, বরং মাদকের সহজলভ্যতা কমানো, আসক্তি প্রতিরোধ এবং সুস্থ জীবনে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়ার অঙ্গীকার তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি ও দৃশ্যমান ফলাফলে প্রতিফলিত হবে। তাই আর বিলম্ব নয়—এখনই চাই সময়াবদ্ধ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনা।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad