ভুয়া জনমত জরিপে উন্মোচিত যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনি ব্যবস্থার দুর্বলতা

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২০ দুপুর
  • ৩৭০৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে একের পর এক ভুয়া জনমত জরিপ প্রকাশের ঘটনায় দেশটির নির্বাচনি তথ্যব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এসেছে। কয়েকটি প্রতারণামূলক প্রতিষ্ঠান কাল্পনিক জরিপের ফল প্রকাশ করেছে, যা সংবাদমাধ্যম ও জনমত জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থাগুলোর কাছেও পৌঁছেছে। এতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, কীভাবে যাচাইহীন তথ্য সহজেই বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়ে নির্বাচনি আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভুয়া জরিপ নির্বাচনি প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ ছড়ানোর পাশাপাশি প্রকৃত জনমত জরিপের ওপরও ভোটারদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে এসব তথ্য দলীয় প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠার ঝুঁকিও রয়েছে।

পরীক্ষামূলক প্রকল্পের নামে ভুয়া জরিপ

চলতি মাসের শুরুতে ওয়েজউড পোলস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিবৃতিতে স্বীকার করে, টেক্সাস, ওহাইও, মিশিগান, কানসাস ও মেইনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্য নিয়ে প্রকাশিত তাদের জরিপের ফল ভুয়া ছিল।

প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের কার্যক্রমকে ‘পরীক্ষামূলক প্রকল্প’ হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের জনমত জরিপ খাতের দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং এ খাতে প্রবেশের সহজ সুযোগ তুলে ধরাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ভোটার ও সংবাদমাধ্যমের কাছে বানানো জরিপ কত সহজে গ্রহণযোগ্যতা পায়, তা পরীক্ষা করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানায় তারা।

তবে ওয়েজউডের স্বীকারোক্তির আগেই তাদের জরিপ বিভিন্ন রাজনৈতিক তথ্যভান্ডার ও সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের নির্বাচনি জরিপের তথ্যভান্ডারেও প্রতিষ্ঠানটির ফল অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

২০২৬ সালের নির্বাচনি মৌসুমে এটি এ ধরনের দ্বিতীয় ঘটনা। এর আগে গত আগস্টে মিডিয়ান স্ট্র্যাটেজিস নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানও ভুয়া জরিপ প্রকাশের কথা স্বীকার করে। তারাও ঘটনাটিকে ‘স্বল্পমেয়াদি সামাজিক পরীক্ষা’ বলে দাবি করেছিল।

যাচাইপ্রক্রিয়া পেরিয়েও ধরা পড়েনি জালিয়াতি

জুনে যাত্রা শুরু করা ওয়েজউড বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন নিয়ে জরিপ প্রকাশ করেছিল। এসব ফল রাজনৈতিক প্রচারশিবির, ভাষ্যকার ও জরিপের তথ্য সংগ্রহকারী সংস্থাগুলোর নজরে আসে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তাদের নির্বাচনি জরিপের তথ্যভান্ডারে ওয়েজউডের ১৫টি জরিপ অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরে সেগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। সংবাদপত্রটি জানায়, ওয়েজউডের কর্মী, জরিপপদ্ধতি ও অর্থায়ন সম্পর্কে প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়ার পরই জরিপগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটির জরিপ তাদের প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কিংবা জাতীয় কংগ্রেস নির্বাচনসংক্রান্ত গড় জনমত জরিপে যুক্ত করা হয়নি।

জরিপ ও নির্বাচনি পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করা ওয়েবসাইট ফিফটি প্লাস ওয়ান ওয়েজউডের কার্যক্রম তদন্ত করে। তাদের অনুসন্ধানে জরিপের মূল তথ্যের অসংগতি এবং উত্তরদাতাদের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রযুক্তিগত শনাক্তকারী তথ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। পরে ওয়েজউড স্বীকার করে, তাদের প্রকাশিত অধিকাংশ জরিপের ফলই বানানো।

ফিফটি প্লাস ওয়ানের তদন্তে যুক্ত তথ্য সাংবাদিক জি এলিয়ট মরিস ওয়েজউডের ‘সামাজিক পরীক্ষা’র দাবিকে প্রতারণা আড়াল করার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেন।

ভুয়া জরিপে ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীর প্রচারণা

ভুয়া জরিপের প্রভাব যে শুধু তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতায় সীমাবদ্ধ নয়, তার উদাহরণ মিশিগানের ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে পরাজিত ম্যালরি ম্যাকমরো। তাঁর দাবি, ওয়েজউডের একটি জরিপে তাঁর সমর্থন এক অঙ্কে দেখানো হয়েছিল। এতে নির্বাচনি প্রচারণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ম্যাকমরোর ভাষ্য অনুযায়ী, জরিপের ফল দেখে প্রচারকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন। সাংবাদিকেরা তাঁকে নির্বাচনি লড়াই থেকে সরে দাঁড়াবেন কি না, সে প্রশ্ন করতে থাকেন। একই সঙ্গে অনুদান কমে যায় এবং দলের সমর্থকেরা অন্য প্রার্থীদের প্রচারণায় অর্থ দিতে শুরু করেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ম্যাকমরো ওয়েজউড এবং মিচেল রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশনসের আরেকটি জরিপকে তাঁর প্রচারণার জন্য ‘জোড়া আঘাত’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, জরিপ দুটি তাঁর প্রচারণাকে ধ্বংস করে দেয়। জুলাইয়ে তিনি সিনেট নির্বাচনের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো জরিপ বাস্তব জনমত তুলে ধরতে ব্যর্থ হলেও সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করার কারণে প্রার্থী, ভোটার ও দাতাদের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত হতে পারে।

রাজনৈতিক মেরুকরণে আস্থার সংকট

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর অ্যান ইনফর্মড পাবলিক ওয়েজউডের স্বীকারোক্তি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আলোচনা পর্যবেক্ষণ করেছে। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুরুতে জরিপ বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচনি তথ্য অনুসরণকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোতে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ও জরিপ সংগ্রহকারী সংস্থাগুলো ওয়েজউডের ফল প্রকাশ করেছিল—এ বিষয়টি সামনে এনে কেউ কেউ সামগ্রিকভাবে জনমত জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে ডেমোক্র্যাটদের ভালো অবস্থান দেখানো জরিপগুলোকে অবিশ্বাস্য হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ ঘটনায় দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সমালোচনা করেন। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি সংবাদপত্রটির নির্বাচনি তথ্যভান্ডারে ওয়েজউডের জরিপ অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘কৃত্রিম’ বলে আখ্যা দেন। এ ঘটনায় সংবাদপত্রটির বিরুদ্ধে তাঁর ১৫ বিলিয়ন ডলারের মানহানির মামলাও আরও শক্তিশালী হবে বলে দাবি করেন ট্রাম্প।

ভুয়া জরিপ ঠেকাতে আইন ও স্বচ্ছতার দাবি

যুক্তরাষ্ট্রে ভুয়া জনমত জরিপ প্রকাশকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। কিছু অধিকারকর্মী সংগঠন ও আইন বিশেষজ্ঞের মতে, পরিস্থিতিভেদে এ ধরনের প্রতারণাকে পণ্য বা তারবার্তা জালিয়াতি হিসেবে বিবেচনার সুযোগ থাকতে পারে।

২০২০ সালে মিসৌরি ল রিভিউ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক লেখায় টাইলার ইয়ারগেইন ভুয়া জরিপের বিরুদ্ধে আগাম ব্যবস্থা ও সচেতনতা তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে ভুয়া জরিপকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার ঠেকাতে আইন প্রয়োগের সুযোগ আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) প্রধান ব্রেন্ডন কার বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ভুয়া জরিপের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব জরিপ প্রচার না করতে সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি সতর্ক করেন, সংবাদ বিকৃতি বা সম্প্রচার প্রতারণার অভিযোগে সম্প্রচার লাইসেন্স ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

তবে এফসিসির একমাত্র ডেমোক্রেটিক কমিশনার আনা গোমেজ এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাঁর মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করা জরিপকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। কিন্তু প্রকাশ্যে পাওয়া জরিপের তথ্য সৎ উদ্দেশ্যে সংবাদমাধ্যমে প্রচারের জন্য সম্প্রচারকারীদের শাস্তি দেওয়া উচিত নয়।

ক্যালিফোর্নিয়ার পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জরিপ পরিচালক মার্ক বালদাসারে বলেন, জরিপের




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad