পবিত্র কুরআনের সুরা আশ-শূরার ৪৯-৫০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। কাউকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দেন, আবার কাউকে নিঃসন্তান রাখেন।
এ আয়াতের শিক্ষা হলো, সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে—তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তাই কন্যাসন্তানের জন্মের জন্য মাকে দায়ী করা বা তাকে হেয় করা কুরআনের শিক্ষার পরিপন্থী।
কন্যাসন্তানকে অবজ্ঞার নিন্দাইসলামপূর্ব আরব সমাজে কন্যাসন্তানের জন্মকে লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। পবিত্র কুরআনের সুরা আন-নাহলের ৫৮-৫৯ নম্বর আয়াতে এ মানসিকতার সমালোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কন্যাসন্তানের সুসংবাদ পেলে কিছু মানুষের মুখমণ্ডল কালো হয়ে যেত এবং তারা মনোকষ্টে ভুগত।
অন্যদিকে, সুরা আত-তাকভিরের ৮-৯ নম্বর আয়াতে জীবন্ত সমাহিত কন্যাশিশুকে জিজ্ঞাসা করার কথা উল্লেখ রয়েছে—কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?
এসব আয়াত কন্যাশিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা, বৈষম্য ও অবজ্ঞার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেয়।
কন্যাসন্তানের লালন-পালনের মর্যাদাকন্যাসন্তানকে ভালোবাসা ও যত্নের সঙ্গে বড় করে তোলার গুরুত্ব হাদিসেও তুলে ধরা হয়েছে। সহিহ মুসলিমের ২৬৩১ নম্বর হাদিসে দুই মেয়েকে সাবালিকা হওয়া পর্যন্ত লালন-পালনকারীর জন্য কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভের সুসংবাদ বর্ণিত হয়েছে।
সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনের মধ্যে শুধু খাবার, পোশাক ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করাই নয়; তার শিক্ষা, নিরাপত্তা, মানসিক বিকাশ এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের সুযোগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরাধিকারে নারীর অধিকারকন্যাসন্তানের অধিকার রক্ষায় উত্তরাধিকারের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআনের সুরা আন-নিসার ৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষের পাশাপাশি নারীরও নির্ধারিত অংশ রয়েছে।
অতএব, মেয়ে বিবাহিত—এ অজুহাতে তাকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারিত হবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী। পরিবারের সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে নারীর এই অধিকার যথাযথভাবে স্বীকার ও বাস্তবায়ন করা জরুরি।
বিয়েতে নারীর সম্মতির গুরুত্ববিয়ের ক্ষেত্রেও নারীর মতামত ও সম্মতির গুরুত্ব রয়েছে। সুনান আবু দাউদের ২০৯৬ নম্বর হাদিসে অনিচ্ছায় দেওয়া বিয়ে নিয়ে অভিযোগকারী এক নারীর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ ঘটনা থেকে বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর সম্মতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়।
কন্যাসন্তানের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং অনিচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বাধ্য না করা ইসলামের ন্যায়সংগত শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মোহরানা নারীর নিজস্ব অধিকারপবিত্র কুরআনের সুরা আন-নিসার ৪ নম্বর আয়াতে নারীদের মোহরানা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। আয়াতটিতে আরও বলা হয়েছে, স্ত্রী নিজের সন্তুষ্টিতে মোহরানার কোনো অংশ ছেড়ে দিলে তা গ্রহণ করা যেতে পারে।
অর্থাৎ মোহরানা স্ত্রীর নিজস্ব অধিকার। তার স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি ছাড়া এ অর্থ নেওয়া উচিত নয়।
কন্যাসন্তানের মর্যাদা নিশ্চিত করা পরিবারের দায়িত্বকুরআন ও হাদিসের শিক্ষা অনুযায়ী, কন্যাসন্তান কোনো বোঝা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। তার জন্মকে আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করা, ভালোবাসা ও সম্মান দেওয়া এবং শিক্ষা, সম্পদ ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা পরিবারের দায়িত্ব।
কন্যাসন্তানের জন্মের জন্য মাকে দোষারোপ করা, মেয়েকে অবহেলা করা কিংবা তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনো সুযোগ নেই। পরিবার ও সমাজে কন্যাসন্তানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় কুরআন ও সুন্নাহর এসব নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: পবিত্র কুরআন—সুরা আশ-শূরা, আয়াত ৪৯-৫০; সুরা আন-নাহল, আয়াত ৫৮-৫৯; সুরা আত-তাকভির, আয়াত ৮-৯; সুরা আন-নিসা, আয়াত ৪ ও ৭। হাদিস: সহিহ মুসলিম, ২৬৩১; সুনান আবু দাউদ, ২০৯৬।
সূত্র: যুগান্তর, ‘কন্যাসন্তান নিয়ে যা বলেছে পবিত্র কুরআন’, প্রকাশিত ১৩ অক্টোবর ২০২৬।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক