ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা ওয়াহিদুদ্দিন খানের ‘হিউম্যান ভ্যালুজ ইন ইসলাম’ শীর্ষক প্রবন্ধে মানুষের সহজাত নৈতিক বোধ এবং ইসলামি শিক্ষায় তার বিকাশের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সিপিএস ইন্টারন্যাশনালে প্রকাশিত ওই প্রবন্ধের আলোকে বলা যায়, মানুষের বিবেক ও বিচারবুদ্ধি তাকে ভালো-মন্দের পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে। আর ইসলামি দিকনির্দেশনা সেই বোধকে শুদ্ধ ও সুসংহত করে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নৈতিকতার চর্চায় উদ্বুদ্ধ করে।
সহজাত নৈতিক বোধ ও ইসলামি দিকনির্দেশনাইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ উপলব্ধির একটি সহজাত ক্ষমতা রয়েছে। সত্য বলা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়াকে মানুষ সাধারণত ভালো গুণ হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে মিথ্যা, ছলনা, প্রতারণা ও অহংকারকে অনৈতিক বলে মনে করে।
তবে মানুষের নৈতিক বোধ সব পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। এ কারণে ইসলামি বিশ্বাসে নবী-রাসুলদের মাধ্যমে মানুষের কাছে স্রষ্টার নির্দেশনা পৌঁছানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর নাজিল হওয়া পবিত্র কোরআন মানুষের জীবন পরিচালনার পথনির্দেশনা দেয়। মহানবী (সা.)-এর জীবনাচরণও নৈতিকতা ও উত্তম চরিত্রের বাস্তব উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত।
আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়ার গুরুত্বইসলামে নৈতিক চরিত্র গঠনের অন্যতম ভিত্তি তাকওয়া বা আল্লাহ-সচেতনতা। এর অর্থ আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং নিজের কাজের জন্য জবাবদিহির অনুভূতি ধারণ করা।
মানুষের মধ্যে ভালো গুণাবলি থাকলেও লোভ, ক্রোধ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও প্রলোভন তাকে অন্যায়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাকওয়া এসব প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আত্মসচেতনতা ও আত্মসংযম গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তাই সুন্দর চরিত্র গঠনে শুধু বাহ্যিক আচরণ সংশোধন নয়, চিন্তা, উদ্দেশ্য ও অভ্যাসের শুদ্ধতাও জরুরি।
পবিত্র কোরআনের সূরা আশ-শামসের ৭ থেকে ১০ নম্বর আয়াতে আত্মার পরিশুদ্ধি ও কলুষিত করার প্রসঙ্গ এসেছে। আয়াতগুলোর মর্ম অনুযায়ী, যে ব্যক্তি নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, সে সফল হয়; আর যে তাকে কলুষিত করে, সে ব্যর্থ হয়।
যেসব গুণের চর্চা জরুরিকোরআন ও মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা অনুসারে সুন্দর চরিত্র গঠনে কয়েকটি গুণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সত্যবাদিতা ও সততা: কথা ও কাজে সত্যনিষ্ঠ থাকা এবং প্রতারণা থেকে দূরে থাকা।
আমানতদারি ও দায়িত্বশীলতা: অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা।
বিনয় ও ভদ্রতা: অহংকার পরিহার করে অন্যের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা।
সহমর্মিতা ও উদারতা: অন্যের প্রয়োজন ও কষ্ট উপলব্ধি করে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করা।
ক্ষমাশীলতা ও সহনশীলতা: অন্যের ভুলের ক্ষেত্রে যথাসম্ভব সংযম ও ক্ষমার পরিচয় দেওয়া।
ধৈর্য ও দৃঢ়তা: প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ন্যায়সংগত অবস্থানে অবিচল থাকা।
কৃতজ্ঞতা ও আত্মমর্যাদা: প্রাপ্ত অনুগ্রহের মূল্যায়ন করা এবং নিজের মর্যাদা বজায় রাখা।
শালীনতা ও আত্মসংযম: ব্যক্তিগত জীবন ও আচরণে সংযম, পরিচ্ছন্নতা ও শালীনতা বজায় রাখা।
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আহজাবের ৩৫ নম্বর আয়াতে বিশ্বাসী নারী-পুরুষের পাশাপাশি সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, বিনয়ী, দানশীল ও সংযমী নারী-পুরুষের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বিশ্বাসের পাশাপাশি নৈতিক গুণাবলি ও সৎকর্মের গুরুত্বও প্রতিফলিত হয়েছে।
পরিহার করতে হবে নেতিবাচক প্রবণতাসুন্দর চরিত্র গঠনে ভালো গুণ অর্জনের পাশাপাশি মন্দ অভ্যাস ও প্রবণতা থেকে দূরে থাকাও জরুরি। মিথ্যা বলা, প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, কপটতা, অহংকার, কৃপণতা, ঈর্ষা, বিদ্বেষ ও অন্যের ক্ষতি করার প্রবণতা ব্যক্তির নৈতিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
মিথ্যা ও প্রতারণা পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করে। ঈর্ষা ও বিদ্বেষ সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে, আর অহংকার মানুষকে অন্যের মর্যাদা ও অনুভূতির প্রতি উদাসীন করে তুলতে পারে। এসব প্রবণতা পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও বৃহত্তর সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে সততা, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা বাড়ায়। ফলে সামাজিক সম্প্রীতি ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে ওঠে। তাই নেতিবাচক প্রবণতা পরিহার করা শুধু ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির বিষয় নয়; সুস্থ সমাজ গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
নিয়মিত চর্চায় গড়ে ওঠে উত্তম চরিত্রনৈতিক চরিত্র এক দিনে গড়ে ওঠে না। প্রতিদিন সত্য বলা, দায়িত্ব পালন, অন্যের সঙ্গে নম্র আচরণ করা, ভুল হলে তা স্বীকার করা এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মতো কাজ ধীরে ধীরে মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়।
ইসলামি শিক্ষায় অল্প হলেও নিয়মিত সৎকর্মের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এই শিক্ষার তাৎপর্য হলো, বড় কোনো কাজের অপেক্ষায় না থেকে দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ভালো কাজের চর্চা করা। রাগ নিয়ন্ত্রণ, অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত না হওয়া এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ন্যায়সংগত অবস্থান ধরে রাখার মাধ্যমে মানুষ নৈতিকভাবে দৃঢ় হতে পারে।
ব্যক্তিগত নৈতিকতা থেকে সামাজিক কল্যাণমানবিক মূল্যবোধের চর্চা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের কথাবার্তা, আচরণ, দায়িত্ব পালন ও পারস্পরিক সম্পর্কেও এর প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। সত্যবাদিতা, সততা, বিনয়, ধৈর্য ও ক্ষমাশীলতা ব্যক্তিকে আত্মশুদ্ধির পথে এগিয়ে নেয়; আর মিথ্যা, প্রতারণা, অহংকার ও বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা সামাজিক সম্পর্ককে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।
মানুষের নৈতিক বোধকে সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং প্রতিদিনের আচরণে তার প্রতিফলন ঘটানোই সুন্দর চরিত্র গঠনের মূল কথা। ব্যক্তিগত জীবনে সৎকর্ম, আত্মসংযম ও দায়িত্বশীলতার চর্চা বাড়লে পরিবার ও সমাজেও ন্যায়, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার পরিবেশ শক্তিশালী হতে পারে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক