প্রায় ১ হাজার ৪০০ বছর আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল-আয়নু হাক্ক’—নজর সত্য। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে একই মর্মের হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সহিহ মুসলিমের ৫৫৯৫ নম্বর হাদিসে এসেছে, ‘নজর সত্য; যদি কোনো কিছু তাকদির অতিক্রম করতে পারে, তবে তা হলো নজর।’
পবিত্র কোরআনের সুরা ফালাকেও আল্লাহ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন—‘হিংসুক যখন হিংসা করে, তার অনিষ্ট থেকে আমি আশ্রয় চাই।’ (সুরা আল-ফালাক : ৫)
দৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনুভূতিওএবার প্রশ্ন আসে, দৃষ্টির পেছনে বিজ্ঞান কী যুক্তি দেয়? মানুষ যখন কারও দিকে তাকায়, তখন শুধু চোখই কাজ করে না। সেই দৃষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অনুভূতি, মূল্যায়ন, আকর্ষণ, ঈর্ষা, ভয় কিংবা বিদ্বেষ। ভালোবাসার চোখে কাউকে দেখা আর হিংসার চোখে দেখা এক বিষয় নয়।
আধুনিক বিজ্ঞান মানুষের সামাজিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছে। বিশেষ করে Social-Evaluative Threat বা অন্যের নেতিবাচক মূল্যায়নের আশঙ্কা মানুষের শরীরে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, তা নিয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণা হয়েছে।
মনোবিজ্ঞানী Sally S. Dickerson ও Margaret E. Kemeny-এর ২০০৪ সালের একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় দেখা যায়, সামাজিকভাবে মূল্যায়িত বা বিচারিত হওয়ার আশঙ্কা মানুষের শরীরে cortisol-নির্ভর stress response বাড়াতে পারে। (Dickerson, S. S., & Kemeny, M. E. 2004)
অর্থাৎ অন্যের দৃষ্টি বা মূল্যায়ন সবসময় আমাদের শরীরের কাছে অর্থহীন কোনো বিষয় নয়। কেউ এমনভাবে তাকালে, যাতে মনে হয় আপনাকে বিচার করা হচ্ছে, কিছুক্ষণ পর বুক ধড়ফড় করা, অস্বস্তি, হাত ঘামা কিংবা মাথা ভার লাগার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। কারণ আমাদের মস্তিষ্ক সামাজিক হুমতিকেও কখনো কখনো বাস্তব চাপ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে শরীরে stress response তৈরি হতে পারে।
মন ও শরীর যে সম্পূর্ণ আলাদা কোনো জগৎ নয়, বিজ্ঞান এখন বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারে।
নেতিবাচক প্রত্যাশারও প্রভাব আছেএখানে আসে Nocebo Effect-এর বিষয়টি। কোনো নেতিবাচক প্রত্যাশা, ভয় কিংবা আশঙ্কা কখনো কখনো মানুষের বাস্তব শারীরিক অস্বস্তিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ কোনো কিছু আমাদের ক্ষতি করবে—এমন প্রত্যাশাও শরীরের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—মানুষের নেতিবাচক অনুভূতি, দৃষ্টি ও সামাজিক আচরণ যে অন্য মানুষের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিকে কি একেবারেই অস্বীকার করা যায়?
প্রশংসার ক্ষেত্রেও বরকতের দোয়ার শিক্ষাসুনান ইবনে মাজাহর ৩৫০৬ নম্বর হাদিসে সাহাবি সাহল ইবন হুনাইফ (রা.)-এর একটি ঘটনা এসেছে। আমির ইবন রাবিয়াহ (রা.) তাকে দেখে তার সৌন্দর্য ও শারীরিক গঠনের প্রশংসা করেছিলেন। এরপর সাহল (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন।
বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জানানো হলে তিনি বলেন, ‘তোমাদের কেউ কেন তার ভাইয়ের জন্য বরকতের দোয়া করে না?’ এরপর তিনি আমির (রা.)-কে গোসল করতে বলেন।
এখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতি করার কথা নেই। বরং একজন মানুষ অন্যজনকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তার প্রশংসা করেছেন। তারপরও রাসুলুল্লাহ (সা.) বরকতের দোয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন। অর্থাৎ অতিরিক্ত প্রশংসার ক্ষেত্রেও সতর্কতার শিক্ষা রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরের নতুন বাস্তবতাসামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই এখন আমরা অন্যের জীবনের নানা দিক দেখতে পাই। কারও নতুন বাড়ি, নতুন গাড়ি, বিয়ে, সন্তান, বিদেশযাত্রা, পুরস্কার কিংবা সাফল্য—সবকিছুই মুহূর্তে আমাদের চোখের সামনে চলে আসে।
কেউ আনন্দ নিয়ে দেখি, কেউ মুগ্ধ হয়ে দেখি। আবার কেউ অজান্তেই ঈর্ষা নিয়ে দেখি।
আমরা প্রায়ই নজরকে শুধু ‘অন্যের চোখের সমস্যা’ হিসেবে দেখি। অথচ নিজের চোখের ভেতর কী আছে, সেটিও ভেবে দেখা দরকার। ইসলাম তাই হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতে শেখায়। একই সঙ্গে কারও ভালো কিছু দেখলে তার জন্য বরকতের দোয়া করতেও শেখায়।
অন্যদিকে বিজ্ঞান দেখাচ্ছে, মানুষের সামাজিক অভিজ্ঞতা, নেতিবাচক মূল্যায়ন ও প্রত্যাশা শরীর ও মনের ওপর বাস্তব প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
অন্যের ভালোতে হিংসা নয়, বরকতের দোয়াকারও ভালো কিছু দেখলে হিংসা না করে তার জন্য বরকত চাইতে পারি। কারও সাফল্য দেখে নিজের অপূর্ণতার হিসাব না কষে তার আনন্দে আনন্দিত হতে পারি। কারও জীবনে ভালো কিছু দেখে শুধু তাকিয়ে না থেকে বলতে পারি—‘আল্লাহ তাকে বরকত দিন।’
কারণ শেষ পর্যন্ত নজর নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়তো শুধু এটি নয় যে, নজর আছে কি নেই। বরং প্রশ্ন হলো—আপনি যখন অন্যের দিকে তাকান, আপনার চোখে আসলে কী থাকে?
লেখক: শিক্ষার্থী, তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স