মক্কা-মদিনায় বাংলার সুলতানের প্রতিষ্ঠিত ‘বাঙালি মাদরাসা’

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১০ দুপুর
  • ২২৯৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg মসজিদে হারামের বাবে উম্মে হানী ও মসজিদে নববির বাবুস সালাম
মধ্যযুগে স্বাধীন সুলতানি বাংলা শুধু রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রেই সমৃদ্ধ ছিল না; শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর শাসকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বাংলার সুলতানদের স্থাপত্য ও জনকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগ আজও সেই সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।

তবে এর মধ্যে সবচেয়ে বিস্ময়কর ও তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত অধ্যায় হলো পবিত্র মক্কা ও মদিনায় বাংলার এক সুলতানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—আল মাদরাসাতুল গিয়াসিয়া আল বাঙ্গালিয়া। ইতিহাসে এসব প্রতিষ্ঠান ‘গিয়াসিয়া মাদরাসা’ বা ‘বাঙালি মাদরাসা’ নামেও পরিচিত ছিল।

মক্কা-মদিনার মতো পবিত্র নগরীতে বাংলার সুলতানের উদ্যোগে দুটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ঘটনা প্রমাণ করে, মধ্যযুগের বাংলা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রান্তিক শাসনাঞ্চল ছিল না। বরং বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানচর্চার নিবিড় যোগাযোগ ছিল।

জ্ঞানপিপাসু সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ

মক্কা ও মদিনার গিয়াসিয়া মাদরাসা দুটির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ইলিয়াস শাহি বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের নাম জড়িয়ে আছে। তিনি ইলিয়াস শাহি বংশের তৃতীয় সুলতান এবং সিকান্দার শাহের পুত্র।

১৩৯০ খ্রিষ্টাব্দে গোয়ালপাড়ার যুদ্ধে সিকান্দার শাহ নিহত হলে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ ক্ষমতায় আসেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তার শাসনকাল আনুমানিক ১৩৮৯-৯০ থেকে ১৪১০-১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত; হিজরি হিসাবে ৭৯২ থেকে ৮১৩ সাল।

তার শাসনামল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কূটনৈতিক সাফল্য এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার জন্য স্মরণীয়। তিনি তরবারির শক্তির পাশাপাশি জ্ঞান ও সাহিত্যের শক্তিকেও গুরুত্ব দিতেন। নিজে আরবি ও ফারসি ভাষায় কবিতা রচনা করতেন এবং পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজ শিরাজির সঙ্গে তার পত্রবিনিময় ছিল বলে জানা যায়।

তার পৃষ্ঠপোষকতায় কবি শাহ মুহম্মদ সগীর ‘ইউসুফ-জোলেখা’ কাব্য রচনা করেন। একই সময়ে কৃত্তিবাস ওঝা বাংলা ভাষায় রামায়ণের অনুবাদ ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’ রচনা করেন বলে ধারণা করা হয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন

গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল বিস্তৃত। দিল্লি সালতানাতের প্রভাব মোকাবিলায় তিনি চীনের মিং সম্রাটের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলেন।

১৪০৫, ১৪০৮ ও ১৪০৯ সালে তিনি চীনে দূত পাঠান। এর প্রতিদানে সম্রাট ইয়ংলের পক্ষ থেকেও দূত ও মূল্যবান উপহার আসে। উত্তর ভারতের জৌনপুর সালতানাতের সঙ্গেও তার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। জৌনপুরের প্রভাবশালী আমির ও মন্ত্রী খাজা জাহানের কাছে তিনি হাতিসহ বিভিন্ন উপহার পাঠিয়েছিলেন।

এই বিস্তৃত কূটনৈতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাই তাকে হেজাজের মতো দূরবর্তী অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।


মক্কায় প্রতিষ্ঠিত হয় গিয়াসিয়া মাদরাসা

১৩৮৯ থেকে ১৪১১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত শাসনামলে সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ একাধিকবার মক্কা ও মদিনাবাসীর জন্য উপঢৌকন পাঠান। ১৪১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার প্রতিনিধি ইয়াকুত গিয়াসিকে বিপুল অর্থসম্পদসহ মক্কার শাসকের কাছে পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল মক্কায় জমি কিনে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা।

অনুমতি পাওয়ার পর ইয়াকুত গিয়াসি মসজিদুল হারামের ‘বাবে উম্মে হানি’র পাশে দুটি বাড়ি কিনে সেখানে আল মাদরাসাতুল গিয়াসিয়া আল বাঙ্গালিয়া প্রতিষ্ঠা করেন।

এ ছাড়া মক্কার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী সাইয়েদ হাসান আজলানের কাছ থেকে দুটি বাগান কিনে মাদরাসার জন্য ওয়াক্ফ করে দেওয়া হয়। বাগান দুটি কেনা হয়েছিল ১২ হাজার মিসকাল স্বর্ণ দিয়ে। পাশাপাশি ৫০০ মিসকাল স্বর্ণ দিয়ে একটি বাড়ি কিনে সেটিও ওয়াক্ফ করা হয়।

এসব ওয়াক্ফ সম্পত্তির আয় থেকেই মাদরাসার যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করা হতো।

৮১৩ হিজরির রমজান মাসে মাদরাসার নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ৮১৪ হিজরির জমাদাল উলা মাসে তা সম্পন্ন হয়। পরে ৮৯৪ হিজরিতে মাদরাসাটি সংস্কার করা হয়।

চার মাজহাবের শিক্ষার ব্যবস্থা

গিয়াসিয়া মাদরাসা ছিল মক্কার প্রথম এমন মাদরাসা, যেখানে ইসলামের চার মাজহাবের শিক্ষা দেওয়া হতো। হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি ও হাম্বলি মাজহাবের জন্য পৃথক শিক্ষক দায়িত্ব পালন করতেন।

শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন জামালুদ্দিন মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ শাফেয়ি, শিহাবুদ্দিন আহমদ বিন জিয়া হিন্দি হানাফি, তাকিউদ্দিন মুহাম্মদ বিন আহমদ ফাসি মালেকি এবং সিরাজুদ্দিন আবদুল লতিফ বিন আবুল ফাতাহ ফাসি হাম্বলি।

মাদরাসাটিতে মোট ৬০ জন শিক্ষার্থীর ব্যবস্থা ছিল। এর মধ্যে ২০ জন শাফেয়ি, ২০ জন হানাফি, ১০ জন মালেকি এবং ১০ জন হাম্বলি মাজহাবের শিক্ষার্থী ছিলেন। তৎকালীন ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থায় এটি ছিল বহুমাত্রিকতা ও সহনশীলতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

ওয়াক্ফের আয় ব্যয় হতো পাঁচ খাতে

মাদরাসার ওয়াক্ফ সম্পত্তি থেকে পাওয়া আয় নির্দিষ্ট পাঁচটি খাতে ব্যয় করা হতো। এর মধ্যে ছিল শিক্ষকদের প্রয়োজন পূরণ, শিক্ষার্থীদের ব্যয়, আবাসিক শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের প্রয়োজন মেটানো, অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, পানি সরবরাহ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ।

সুনির্দিষ্ট এই আর্থিক কাঠামো মাদরাসাটিকে একটি সুসংগঠিত ও টেকসই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল।

খ্যাতিমান আলেমদের জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র

গিয়াসিয়া মাদরাসায় বহু খ্যাতিমান আলেম শিক্ষকতা করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আবদুল ওয়াহাব তাজুদ্দিন বিন জাহিরাহ, আবদুল কাদির ফাসি মক্কি এবং মুহাম্মদ জালাল আবু সাআদাত। তাদের জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে মাদরাসাটির খ্যাতি বিস্তৃত হয়।

এখানকার অনেক শিক্ষার্থীও পরবর্তী সময়ে খ্যাতিমান আলেম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।

মদিনাতেও প্রতিষ্ঠা করা হয় মাদরাসা

সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের জ্ঞানসেবার উদ্যোগ শুধু মক্কায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মদিনাতেও একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন।

তার প্রতিনিধি হাজি ইকবালকে মসজিদে নববির কাছে জমি কিনে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা এবং এর জন্য স্থায়ী ওয়াক্ফ সম্পত্তি নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

হাজি ইকবাল মসজিদে নববির কাছে বাবুস সালামের নিকটবর্তী ‘হুসনুল আতীক’ নামের স্থানে একটি প্রাচীন দুর্গ কিনে সেখানে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে মদিনাতেও জ্ঞানচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র গড়ে ওঠে।

মক্কা ও মদিনার উভয় প্রতিষ্ঠানই পরবর্তী সময়ে ‘গিয়াসিয়া মাদরাসা’ বা ‘বাঙালি মাদরাসা’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

হজযাত্রী ও পবিত্র স্থান উন্নয়নেও অবদান

সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ হজযাত্রীদের সহায়তা এবং পবিত্র স্থানগুলোর উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন। আরাফা ময়দানে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য তিনি ৩০ হাজার মিসকাল স্বর্ণ প্রদান করেন।

তার এসব উদ্যোগ জনকল্যাণমুখী মনোভাবের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের পবিত্র স্থানগুলোর প্রতি তার দায়বদ্ধতারও পরিচয় বহন করে।

কালের গর্ভে হারিয়ে যায় ঐতিহাসিক মাদরাসা

১৫ শতকে প্রতিষ্ঠিত গিয়াসিয়া মাদরাসা হেজাজ অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে এর পতন ঘটে।

মক্কার শরিফ হাসান ইবনে আজলানের আর্থিক অনিয়ম, সুলতানের মৃত্যুর পর অর্থপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া, স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং পরবর্তী সময়ে হারামাইন শরিফাইনের সম্প্রসারণ—এসব কারণে একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ এই বিদ্যাপীঠ শেষ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

সুলতানি বাংলার আন্তর্জাতিক পরিচয়ের সাক্ষ্য

মধ্যযুগের বাংলার ইতিহাসকে শুধু দিল্লি বা উত্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ করে দেখলে এর প্রকৃত পরিচয় স্পষ্ট হয় না। মক্কা ও মদিনায় গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের প্রতিষ্ঠিত গিয়াসিয়া মাদরাসা দুটি প্রমাণ করে, স্বাধীন সুলতানি বাংলা তখন রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জ্ঞানচর্চার শক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্রিয় ছিল।

মক্কা-মদিনার মতো পবিত্র নগরীতে বাংলার এক সুলতানের নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা কেবল তার দানশীলতার নিদর্শন ছিল না; এর মধ্য দিয়ে বাংলার আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং মুসলিম বিশ্বের জ্ঞানচর্চার প্রতি তার অঙ্গীকারও প্রকাশ পায়।

পারস্য, জৌনপুর ও চীনের সঙ্গে বাংলার বিস্তৃত যোগাযোগের প্রেক্ষাপটে গিয়াসিয়া মাদরাসার ইতিহাস তাই সুলতানি বাংলার আন্তর্জাতিক পরিচয় ও জ্ঞানভিত্তিক সাংস্কৃতিক পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad