প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চাপে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩২ বিকাল
  • ১৭৮৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি, কমেছে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে প্রবৃদ্ধির ধারায় থাকলেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান ও আয়বৈষম্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে জি-৭ জোটের অন্য দেশগুলোর তুলনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে আমদানি শুল্ক ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে এবং সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প তাঁর অর্থনৈতিক সাফল্যের কথা তুলে ধরছেন। তাঁর দাবি, ক্ষমতায় আসার পর নাগরিকদের আয় বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি কমেছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের চিত্রে সাফল্যের পাশাপাশি বেশ কিছু দুর্বলতাও উঠে এসেছে।

জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র

সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বার্ষিক ২ দশমিক ২ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ। এ সময়ে জি-৭ জোটের অন্য সদস্য দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির হার বেশি।

বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিনিয়োগ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখছে। তবে এ খাতে বিনিয়োগের গতি কমে গেলে মার্কিন অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

শুল্কনীতি ও ইরান যুদ্ধে বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ

২০২৫ সালে ট্রাম্পের ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কনীতি বাস্তবায়নের পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। যদিও আশঙ্কার তুলনায় অর্থনীতি ভালো অবস্থানে রয়েছে, তবে আমদানি শুল্কের প্রভাবে পণ্যের দাম বেড়েছে বলে অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

এর পাশাপাশি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও।

গত সেপ্টেম্বরে দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রতি গ্যালন ৬ ডলার ৫২ সেন্টে পৌঁছায়, যা রেকর্ড। কৃষি ও শিল্প খাতে বহুল ব্যবহৃত এই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে। এ সময়ে গরুর মাংস ও কফির দামও বেড়েছে। তবে ডিমের দাম কিছুটা কমেছে।

উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের শাসনামলে ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি সর্বোচ্চ ৯ শতাংশে পৌঁছেছিল। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার সেই পর্যায়ের নিচে থাকলেও ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি না থাকলে তা আরও কম হতে পারত বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা।

আয় বাড়লেও সুবিধা পাচ্ছে না সব শ্রেণি

মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে হিসাব করলে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারের মধ্যম আয় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ৮৭ হাজার ৪৬০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। দেশটির ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ মধ্যম আয়।

তবে আয়ের এই বৃদ্ধি সব শ্রেণির মানুষের জন্য সমান সুবিধা বয়ে আনেনি। ইনস্টিটিউট অন ট্যাক্সেশন অ্যান্ড ইকোনমিক পলিসি (আইটিইপি)-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মধ্যম আয়ের ২০ শতাংশ পরিবার আগের তুলনায় গড়ে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ডলার কম সুবিধা পাচ্ছে। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ সুবিধা কমেছে প্রায় ৭৫০ ডলার।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের কর ছাড়ের নীতির কারণে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষ অন্যান্য পরিস্থিতির তুলনায় গড়ে ১২ হাজার ৫৬০ ডলার বেশি সুবিধা পাচ্ছেন বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ হিসাবের সঙ্গে ট্যাক্স ফাউন্ডেশন নামের আরেকটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণেরও মিল রয়েছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমেছে

ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি ছিল, আমদানি শুল্ক আরোপের ফলে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপন করবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তবে বাস্তবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে মার্কিন অর্থনীতিতে প্রতি মাসে গড়ে ৩৪ হাজার নতুন চাকরি যুক্ত হয়েছে। অথচ বাইডেনের প্রেসিডেন্সির শেষ বছরে প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ২২ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল। অর্থাৎ আগের প্রশাসনের শেষ বছরের তুলনায় ট্রাম্পের সময়ে চাকরি সৃষ্টির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বাড়ছে সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি। ট্রাম্প প্রশাসনের কর ছাড়ের নীতিও এ ঘাটতি বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে মার্কিন ফেডারেল সরকারের বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ ট্রিলিয়ন ডলারে, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের ধারণা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৮ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের ধীরগতি, আয়বৈষম্য এবং সরকারি ঋণের চাপ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad