হার্ভার্ডে ভর্তির নামে লাখ লাখ রুপি প্রতারণা, প্রাণ গেল পাকিস্তানি তরুণীর

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ দুপুর
  • ৩৯৩৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
জমি ও পরিবারের গয়না বিক্রি করে অর্থ জোগান বাবার; ভুয়া কাগজপত্র জানার পর মৃত্যু, আত্মহত্যা নাকি হত্যার অভিযোগ—তদন্ত চলছে

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে জমি ও পরিবারের গয়না বিক্রি করেছিলেন পাকিস্তানের ২৪ বছর বয়সী লাইবা ইজাজের বাবা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুহাম্মদ নোমান নামের এক ব্যক্তি তাঁদের কাছ থেকে লাখ লাখ রুপি হাতিয়ে নেন। পরে ভর্তিসংক্রান্ত কাগজপত্র ভুয়া বলে জানতে পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন লাইবা। গত ৯ অক্টোবর ইসলামাবাদে বাড়ির কাছ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও পরিবার তা মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, প্রতারণার সঙ্গে জড়িত নোমানই লাইবাকে হত্যা করেছেন।

লাইবা পদার্থবিজ্ঞানে স্বর্ণপদক পাওয়া শিক্ষার্থী ছিলেন। ইসলামাবাদের ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছিলেন। হার্ভার্ডে আবেদনের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার কথা বলে নোমানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।

লাইবার বাবা রানা মুহাম্মদ ইজাজের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বাবদ প্রথমে নোমানকে ২২ লাখ পাকিস্তানি রুপি দেওয়া হয়। পরে হার্ভার্ডে আবেদনের জন্য ৭২ লাখ রুপির আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখানোর কথা বলেন নোমান। এ অর্থ তাঁর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে নেওয়া ও ডলারে রূপান্তরের কথা জানানো হয়। মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে জমি ও পরিবারের গয়না বিক্রি করেন ইজাজ।

নোমান নিজেকে সুপ্রিম কোর্টের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে একটি চাকরির পরিচয়পত্রও দেখিয়েছিলেন। তাঁর দেওয়া নথিপত্রের মধ্যে হার্ভার্ডের ভর্তি ও বৃত্তির চিঠি, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনসংক্রান্ত ফরম, স্পনসরশিপের হলফনামা, দূতাবাসের একটি নথি এবং বোস্টনে যাওয়ার বিমানের টিকিট ছিল।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে নোমান সর্বশেষ নথির ফাইলটি পরিবারের হাতে দেন। এতে লাইবার নামে ব্যাংক হিসাবের বিবরণী ও ১২ অক্টোবর ভিসা সাক্ষাৎকারের তারিখ উল্লেখ ছিল। তবে অক্টোবরের শুরুতে নথিগুলো একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে যাচাই করতে গিয়ে পরিবার জানতে পারে, বিমানের টিকিটটি ভুয়া। পরে আইনজীবীর মাধ্যমে পুরো ফাইল পরীক্ষা করালে সব কাগজপত্র জাল বলে নিশ্চিত হন তাঁরা। ৬ অক্টোবর প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারটি ভেঙে পড়ে।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর উদ্ধার মরদেহ

লাইবার বাবা জানান, ৯ অক্টোবর নোমান তাঁদের এলাকার মসজিদে জুমার নামাজ পড়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে আসবেন বলে বার্তা পাঠান। ইজাজ মেয়েকে ঘরে থাকতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান লাইবা।

পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁর খোঁজে বের হন। মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করে বাড়ির কাছাকাছি একটি এলাকায় গিয়ে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে লাইবার মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশকে খবর দেন তাঁর স্বজনেরা।

পুলিশের প্রাথমিক ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আলজাজিরাকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ভিডিও ফুটেজে লাইবাকে হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে একা বাড়ি থেকে বের হতে দেখা গেছে। বাকি ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগতে পারে। তবে লাইবার পরিবার এই ব্যাখ্যা মেনে নেয়নি। বাবার অভিযোগ, নোমানই তাঁর মেয়েকে হত্যা করেছেন।

গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে নোমানের মৃত্যু

প্রতারণার অভিযোগে লাইবার মৃত্যুর দুই দিন পর নোমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ ও ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ) এ ঘটনায় পৃথক মামলা করে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর তদন্তের কাজে নোমানকে নিয়ে তথ্য-প্রমাণ উদ্ধারে যাওয়ার সময় দুটি মোটরসাইকেলে আসা চার ব্যক্তি গুলি চালান। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল নোমানকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া। এ সময় নোমানও গুলিবিদ্ধ হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

২১ অক্টোবর পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি লাইবার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। নোমানের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়ে পাঁচ মিলিয়ন রুপির বেশি অর্থ পরিবারের হাতে তুলে দেন তিনি। তবে অর্থ ফেরত পেলেও মেয়েকে হারানোর ক্ষতি পূরণ হবে না বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।

বিদেশে পড়ার স্বপ্ন, প্রতারণার ঝুঁকি

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনের ‘ওপেন ডোরস’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৩ হাজারের বেশি পাকিস্তানি শিক্ষার্থী ভর্তি ছিলেন। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় এ সংখ্যা ৭৫ শতাংশ বেশি।

পাকিস্তানের এফআইএ জানিয়েছে, নোমান নিবন্ধিত ভিসা এজেন্ট ছিলেন না। দেশটিতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম তদারকির জন্য কার্যকর সরকারি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নেই বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। লাহোরের শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কলেজওয়ার্কসের সহপ্রতিষ্ঠাতা নুশমিয়া সুকেরার ভাষ্য, কোনো শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

লাইবার মৃত্যুর তদন্ত এখনো চলছে। তাঁর পরিবারের অভিযোগ এবং পুলিশের প্রাথমিক তদন্তের মধ্যে অমিল থাকায় মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ফরেনসিক প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad