জাপানের রাজধানী টোকিওর কাবুকিচো এলাকায় প্রকাশ্য রাস্তায় যৌনসেবা বিক্রির প্রবণতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলাকাটির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এতে যৌনকর্মীদের নিরাপত্তা, সহিংসতা ও যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌনসেবা বিক্রেতাদের পাশাপাশি ক্রেতা পুরুষদেরও আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি উঠেছে।
টোকিওর শিনজুকু এলাকার কাবুকিচো রাতের বিনোদন ও পর্যটনের জন্য পরিচিত। ‘নিদ্রাহীন শহর’ হিসেবে পরিচিত এই এলাকায় খাবারের দোকান, পানশালা ও কারাওকে কেন্দ্র করে রাতভর মানুষের আনাগোনা থাকে। তবে এর বিভিন্ন গলিতে অর্থের বিনিময়ে যৌনসেবা দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে নারীদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
জাপানি ভাষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ক্রেতা খোঁজার এ প্রবণতাকে বলা হয় ‘তাচিনবো’। করোনার বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পর থেকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কাবুকিচোতে এভাবে যৌনসেবা দেওয়া নারীর সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না গেলেও গত বছর এলাকার একটি পরিচিত পার্কের আশপাশে এ অভিযোগে ১১২ নারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
আইনে ক্রেতাদের শাস্তির বিধান নেই
জাপানের ১৯৫৬ সালের পতিতাবৃত্তি প্রতিরোধ আইনে জনসমক্ষে অর্থের বিনিময়ে যোনিপথে যৌনমিলনের প্রস্তাব দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা ২০ হাজার ইয়েন জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে যৌনসেবা কিনতে যাওয়া পুরুষদের জন্য একই ধরনের শাস্তির বিধান নেই।
আইনপ্রণেতা ও অধিকারকর্মীদের একাংশের মতে, আইনের এই অসম অবস্থানের কারণে ক্রেতারা শাস্তির ভয় ছাড়াই যৌনসেবা নিতে পারছেন। ফলে রাস্তায় যৌনবাণিজ্যের প্রবণতা বাড়ছে। কাবুকিচোতে বিদেশি পুরুষ ক্রেতার সংখ্যাও বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এলাকার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়া এবং স্মার্টফোনের অনুবাদ অ্যাপ ব্যবহারের কারণে বিদেশিদের জন্য দর-কষাকষিও সহজ হচ্ছে।
কাবুকিচো এলাকায় ঝুঁকিতে থাকা তরুণীদের সহায়তা দেওয়া অলাভজনক সংস্থা রেসকিউ হাবের প্রধান আরাতা সাকামোতো বলেন, এ পরিস্থিতি জাপানের ভাবমূর্তিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে এটি বিদেশিদের সমস্যা নয়, বরং জাপানি সমাজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা।
তাঁর মতে, যৌনসেবার ক্রেতা পুরুষদেরও শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ, বর্তমান আইনে পুরুষেরা জানেন যে তাঁদের আইনি পরিণতির মুখে পড়তে হবে না। এ সুযোগে কেউ কেউ যৌনকর্মীদের সঙ্গে সহিংস আচরণ করছেন, এমনকি যৌন সম্পর্কের দৃশ্য ধারণ করছেন। তবে ক্রেতাদের শাস্তির বিধান চালু হলে যৌনবাণিজ্য আরও গোপন স্থানে চলে যেতে পারে, যা নারীদের ঝুঁকি বাড়াবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
আইন পরিবর্তনের সুপারিশ
গত সেপ্টেম্বরে জাপানের বিচার মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ প্যানেল আইন পরিবর্তনের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বিদ্যমান আইনকে ভারসাম্যহীন উল্লেখ করে যৌনসেবা প্রদানকারীদের পাশাপাশি ক্রেতাদেরও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়। তবে ক্রেতাদের জন্য কী ধরনের শাস্তি নির্ধারণ করা হবে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনটি বর্তমানে বিচার মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় রয়েছে।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্য কাজুনোরি ইয়ামানোইও আইন পরিবর্তনের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যৌনসেবা কেনা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও জাপানে ক্রেতারা অনেকটাই দায়মুক্ত থাকছেন।
এদিকে কাবুকিচোর বাসিন্দাদের মধ্যেও রাস্তায় যৌনবাণিজ্য নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। তাঁদের অভিযোগ, এ কর্মকাণ্ড এলাকার পরিবেশ ও সুনাম ক্ষুণ্ন করছে। স্থানীয় কর্মকর্তা ও বাসিন্দাদের সংগঠনগুলো নিয়মিত টহল দেওয়ার পাশাপাশি জাপানি ও ইংরেজি ভাষায় প্রচার চালিয়ে রাস্তায় যৌনসেবা বিক্রি বেআইনি বলে সতর্ক করছে। তবে এসব উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে স্থানীয় এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
পুলিশের তৎপরতা ও গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার হওয়ায় যৌনসেবা বিক্রেতারা এখন শিনজুকু স্টেশনের কাছাকাছি লাভ হোটেলের প্রবেশপথসংলগ্ন সরু গলিগুলোতে অবস্থান নিচ্ছেন। গত বছর কাবুকিচোতে ৭৫ নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল; তাঁদের মধ্যে নয়জন কিশোরী ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধিকারকর্মীদের তথ্য অনুযায়ী, ওই এলাকায় এক ঘণ্টার যৌনসেবার গড় মূল্য ১৫ হাজার ইয়েন বা প্রায় ৯৫ ডলার। তুলনামূলক কম বয়সী কিংবা আকর্ষণীয় নারীদের ক্ষেত্রে বেশি অর্থ নেওয়া হয়। সুরক্ষা ছাড়াই যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্যও বাড়তি অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন। মূল তথ্য: আজকের পত্রিকা।
বিভাগ: আন্তর্জাতিক

প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক