১৯৬৫ সালের ২ নভেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন শাহরুখ খান। বাবা তাজ মোহাম্মদ খান এবং মা লতিফ ফাতিমার সন্তান শাহরুখের শৈশব ও বেড়ে ওঠা দিল্লিতেই। হংসরাজ কলেজে পড়াশোনার পর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় গণযোগাযোগ বিষয়ে ভর্তি হলেও অভিনয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে পড়াশোনা শেষ করেননি। থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ব্যারি জনের কাছে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন তিনি।
টেলিভিশন থেকে বলিউডে যাত্রাআশির দশকের শেষ দিকে টেলিভিশনে অভিনয়ের মাধ্যমে বিনোদনজগতে পা রাখেন শাহরুখ। ১৯৮৮ সালে ‘ফৌজি’ ধারাবাহিকে অভিনয় করে প্রথম পরিচিতি পান। পরে ‘সার্কাস’সহ কয়েকটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয় করে দর্শকদের নজরে আসেন।
১৯৯২ সালে ‘দিওয়ানা’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তার। প্রথম ছবিতেই দর্শকদের প্রশংসা পাওয়ার পাশাপাশি ফিল্মফেয়ার পুরস্কারে সেরা নবাগত অভিনেতার স্বীকৃতি অর্জন করেন।
তবে শুরুতেই প্রচলিত রোমান্টিক নায়কের ছকে নিজেকে আটকে রাখেননি শাহরুখ। ‘বাজিগর’, ‘ডর’ ও ‘আঞ্জাম’-এর মতো সিনেমায় নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়ক্ষমতার ভিন্ন দিক তুলে ধরেন। বিশেষ করে ‘বাজিগর’ ও ‘ডর’ তাকে বলিউডে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়।
রোমান্টিক নায়ক থেকে বলিউড বাদশাহ১৯৯৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ শাহরুখের ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে। কাজলের সঙ্গে অভিনীত সিনেমাটি ভারত ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ছবিতে রাজ মালহোত্রা চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন কোটি দর্শকের স্বপ্নের নায়ক।
এরপর ‘দিল তো পাগল হ্যায়’, ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’ ও ‘কাভি খুশি কাভি গম’-এর মতো সিনেমা তাকে রোমান্টিক নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে তার অভিনয়জীবনের সাফল্য কেবল প্রেমের গল্পে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
‘দেবদাস’, ‘স্বদেশ’, ‘চাক দে! ইন্ডিয়া’ ও ‘মাই নেম ইজ খান’-এর মতো সিনেমায় ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে সমালোচকদের প্রশংসা অর্জন করেন তিনি। ‘চাক দে! ইন্ডিয়া’ সিনেমায় কবির খান এবং ‘স্বদেশ’-এ বিজ্ঞানী মোহন ভার্গব চরিত্রে তার অভিনয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
অন্যদিকে ‘ডন’, ‘ডন ২’, ‘রাওয়ান’ ও ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’-এর মতো সিনেমায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে অ্যাকশন ঘরানাতেও নিজের অবস্থান শক্ত করেন শাহরুখ।
ব্যর্থতা পেরিয়ে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনক্যারিয়ারের দীর্ঘ পথচলায় সাফল্যের পাশাপাশি কঠিন সময়ও পার করেছেন এই অভিনেতা। ‘জাব হ্যারি মেট সাজাল’ ও ‘জিরো’র মতো সিনেমা প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সাফল্য পায়নি। ২০১৮ সালের পর কয়েক বছর বড় পর্দায় প্রধান চরিত্রে নিয়মিত দেখা যায়নি তাকে।
তবে বিরতি ও সমালোচনা পেরিয়ে ২০২৩ সালে ‘পাঠান’ সিনেমার মাধ্যমে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করেন শাহরুখ। বিশ্বব্যাপী সিনেমাটির ব্যাপক ব্যবসায়িক সাফল্য তার জনপ্রিয়তাকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসে। একই বছর মুক্তি পাওয়া ‘জওয়ান’ও বক্স অফিসে সাড়া ফেলে। এরপর ‘ডানকি’ সিনেমায় ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়বৈচিত্র্যের প্রমাণ দেন।
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিদীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন শাহরুখ খান। ২০০৫ সালে ভারত সরকারের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রীতে ভূষিত হন তিনি।
এ ছাড়া ২০০৭ সালে ফ্রান্স সরকারের ‘অর্ডার অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স’ এবং ২০১৪ সালে ‘লেজিওঁ দ্য অনার’ সম্মাননা লাভ করেন। ২০২৫ সালে ‘জওয়ান’ সিনেমায় অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতিও পান তিনি।
ভারতের বাইরেও এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে তার বিশাল ভক্তগোষ্ঠী। আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে ভারতীয় চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য।
অভিনয়ের পাশাপাশি ব্যবসায়ও সফলশাহরুখের পরিচয় শুধু অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। ২০০২ সালে স্ত্রী গৌরী খানকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট। চলচ্চিত্র প্রযোজনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস নিয়েও কাজ করে।
ক্রিকেটেও রয়েছে তার বিশেষ আগ্রহ। অভিনেত্রী জুহি চাওলা ও ব্যবসায়ী জয় মেহতার সঙ্গে যৌথভাবে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের মালিকানায় যুক্ত রয়েছেন তিনি। দলটি তিনবার আইপিএল শিরোপা জিতেছে।
ব্যক্তিজীবনে ১৯৯১ সালে গৌরী খানকে বিয়ে করেন শাহরুখ। তাদের তিন সন্তান—আরিয়ান, সুহানা ও আব্রাম।
৬১ বছরেও নতুন সিনেমার চমক৬১ বছরে পা দিয়েও অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ও কর্মব্যস্ততা ধরে রেখেছেন শাহরুখ। জন্মদিন উপলক্ষে ভক্তদের জন্য বিশেষ উপহার হিসেবে তার আসন্ন সিনেমা ‘কিং’-এর প্রথম গান প্রকাশ করা হয়েছে।
সিদ্ধার্থ আনন্দ পরিচালিত সিনেমাটিতে শাহরুখের সঙ্গে অভিনয় করছেন দীপিকা পাড়ুকোন ও তার মেয়ে সুহানা খানসহ অন্যরা। ছবিটি চলতি বছরের ২৪ ডিসেম্বর মুক্তির কথা রয়েছে।
দিল্লির একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত তারকা হয়ে ওঠার গল্প শাহরুখ খানের। অভিনয়দক্ষতা, পরিশ্রম, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস এবং ব্যর্থতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। পর্দায় দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ানোর বিখ্যাত ভঙ্গি থেকে শুরু করে তার সংলাপ—সবই এখন জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ। তিন দশকের বেশি সময় ধরে দর্শকদের ভালোবাসা ধরে রাখার মধ্য দিয়ে শাহরুখ খান নিজেকে শুধু একজন অভিনেতা নয়, বরং একাধিক প্রজন্মের আবেগের প্রতীকে পরিণত করেছেন।

প্রথম দর্পণ,বিনোদন ডেক্স