হার্ট অ্যাটাকে এক হাসপাতালেই মাসে প্রায় ৭০০ জনের মৃত্যু

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:১৩ দুপুর
  • ৯৯৭৭ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত
বয়স বাড়ার সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে—এমন প্রচলিত ধারণা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। দেশে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী তরুণদের পাশাপাশি ৪৫ বছর বয়সীদের মধ্যেও বাড়ছে হার্ট অ্যাটাক ও হৃদরোগের প্রবণতা। ধমনিতে ব্লকেজ কিংবা গুরুতর হার্ট অ্যাটাক নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন অনেক তরুণ।

রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসের পরিসংখ্যানেও হৃদরোগের বাড়তে থাকা চাপের চিত্র উঠে এসেছে। এ সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ৫ হাজার ৫৫২ জন। অর্থাৎ মাসে গড়ে প্রায় ৬৯৪ জন এবং প্রতিদিন গড়ে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, আট মাসে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯০ জন। এ হিসাবে মাসে গড়ে প্রায় ১৭ হাজার ৩১১ জন এবং প্রতিদিন গড়ে ৫৭০ জন জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ লাখ ৭৮ হাজার ২৪৪ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮১ হাজার ৮৪১ জন।

ঢাকামুখী রোগীর চাপ

দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান না থাকলেও চিকিৎসকদের ধারণা, প্রতি বছর হৃদরোগে মারা যান ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষ। আক্রান্ত হন প্রায় ১০ লাখ। বর্তমানে দেড় কোটির বেশি মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত বলে চিকিৎসকদের ধারণা।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৪ শতাংশ হৃদরোগজনিত কারণে। প্রতি পাঁচজনের একজন অকাল হৃদরোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন বলেও প্রতিষ্ঠানটির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৮৯ হাজার ৭০৩ জন, বহির্বিভাগে ২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬ জন এবং ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ৩১৯ জন। ওই বছর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৭ হাজার ৩৪৮ জন।

২০২৪ সালে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৯৭ জন, বহির্বিভাগে ২ লাখ ৭২ হাজার ২৬০ জন এবং ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ২১৫ জন। ওই বছর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ৭ হাজার ১৪৭ জনের।

দেশের জেলা পর্যায়ের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে হৃদরোগের প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা ও অবকাঠামো না থাকায় রাজধানীমুখী হচ্ছেন রোগীরা। এনজিওগ্রাম, স্টেন্ট স্থাপন, বাইপাস সার্জারি ও ক্যাথল্যাবের মতো চিকিৎসাসুবিধাও মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। বর্তমানে প্রায় ৪০টি হাসপাতালে বিভিন্ন ধরনের হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার হচ্ছে বলে হাসপাতালটির চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

রোগীর ভিড়ে বাড়ছে ভোগান্তি

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপের চিত্রও স্পষ্ট। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টিকিট কাউন্টার, বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও চিকিৎসকের কক্ষের সামনে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। করিডোর ও হাসপাতালের বিভিন্ন স্থানে বসে অপেক্ষা করতে হয় রোগী ও স্বজনদের।

চিকিৎসকেরা বলছেন, বেসরকারি হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসার ব্যয় সরকারি হাসপাতালের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। ফলে আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের বড় একটি অংশ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে সামর্থ্যবানদের একটি অংশ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন।

তরুণদের ঝুঁকি বাড়ছে যেসব কারণে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বংশগত প্রবণতার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও মানসিক চাপ তরুণদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ কারণে অল্প বয়স থেকেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।

বিশ্ব হৃদরোগ দিবস উপলক্ষে গত সোমবার গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহায়তায় গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা আয়োজিত ‘তরুণদের উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বাজেট : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক ওয়েবিনারে জানানো হয়, বিশ্বে প্রতি বছর হৃদরোগের কারণে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ অকালমৃত্যুর শিকার হন। এর অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে বলেও ওয়েবিনারে জানানো হয়।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, হার্ট অ্যাটাকের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে বুকের মাঝখানে তীব্র ব্যথা অন্যতম। এ ব্যথা চোয়াল, বাম কাঁধ বা হাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, এশীয় জনগোষ্ঠীর তরুণদের মধ্যে পারিবারিক ইতিহাস ও জিনগত বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ও পরিবেশগত বিভিন্ন কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে।

তিনি বলেন, রক্তনালির সমস্যা, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের সঙ্গে হৃদরোগের সম্পর্ক রয়েছে। ঝুঁকি কমাতে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাক ও অ্যালকোহল পরিহারের পাশাপাশি অল্প বয়স থেকেই স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad