জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার আওতা বাড়াতে প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন এ ব্যবস্থার বিনিয়োগ কাঠামো, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগ, মুনাফার হার ও গ্রাহকের আস্থা নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
চার স্কিমেই থাকবে শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প
২০২৩ সালে চালু হওয়া সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির চারটি স্কিমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার মানুষ নিবন্ধিত হয়েছেন। এসব স্কিমে জমা হওয়া প্রায় ৩২০ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
চার স্কিমের মধ্যে ‘সমতা’য় সর্বোচ্চ ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন নিবন্ধিত হলেও ‘সুরক্ষা’, ‘প্রবাস’ ও ‘প্রগতি’ স্কিমে অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম।
এ অবস্থায় নতুন প্যাকেজ হিসেবে শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ বৈঠকে এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এর আইনগত ভিত্তি তৈরিতে খসড়া আইন প্রণয়ন করে জাতীয় সংসদে পাঠানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) শেখ কামরুল হাসান জানান, এটি আলাদা কোনো পঞ্চম স্কিম হবে না। ‘প্রবাস’, ‘প্রগতি’, ‘সুরক্ষা’ ও ‘সমতা’—প্রতিটি স্কিমেই প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক বিকল্প থাকবে। ফলে একজন গ্রাহক প্রচলিত মুনাফা পদ্ধতি অথবা শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির যেকোনো একটি বেছে নিতে পারবেন।
বিনিয়োগ কোথায় হবে
শরিয়াহভিত্তিক তহবিলে সুদভিত্তিক সরকারি ট্রেজারি বিল বা বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ না থাকায় তহবিল কোথায় এবং কীভাবে বিনিয়োগ করা হবে—এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা শরিয়াহভিত্তিক ব্যবস্থার কাঠামো, পরিচালন পদ্ধতি, বিনিয়োগ ব্যবস্থা ও কারিগরি বিষয় নির্ধারণে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তহবিলের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি দায়-দায়িত্ব নিয়েও বিশ্লেষণ করা হবে।
সুকুক বন্ডসহ কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করা যাবে এবং আলাদা শরিয়াহ বোর্ড গঠন করা হবে কি না, সেসব বিষয়ও পর্যালোচনায় রয়েছে। আপাতত বাংলাদেশ ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ড ও বিভিন্ন সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরিয়াহ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
আস্থাই বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতি চালু হলে পেনশন কর্মসূচিতে নতুন শ্রেণির মানুষকে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কার্যকর বিনিয়োগ কাঠামো ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে গ্রাহকের আস্থা অর্জন কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক মো. আহসান হাবীবের মতে, সর্বজনীন পেনশনে বিভিন্ন ধরনের গ্রাহকের চাহিদা পূরণে পণ্যের বৈচিত্র্য আনা গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষ্য, দেশে এমন একটি শ্রেণি রয়েছে যারা সুদভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনাগ্রহী হতে পারেন।
আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, শরিয়াহভিত্তিক তহবিলের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে সুকুক, শরিয়াহসম্মত ইক্যুইটি, মুদারাবা ও মুশারাকার মতো বিনিয়োগের সুযোগের ওপর। বাংলাদেশে সুকুকের বাজার এখনো ছোট হওয়ায় পর্যাপ্ত শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের উপকরণ তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তাদের মতে, প্রচলিত স্কিমের তুলনায় মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হলে গ্রাহকদের আগ্রহও কমতে পারে। পাশাপাশি গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে স্বাধীন শরিয়াহ বোর্ড, নিয়মিত শরিয়াহ অডিট এবং বিনিয়োগের স্বচ্ছ প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ।
পেনশন ব্যবস্থায় আরও পরিবর্তন
শরিয়াহভিত্তিক পদ্ধতির পাশাপাশি বিদ্যমান সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। পেনশনার মারা গেলে এতদিন তার স্বামী বা স্ত্রী ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পেতেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ সুবিধার বয়সসীমা বাড়িয়ে ৮০ বছর করা হয়েছে। পেনশনার নিজে জীবদ্দশায় আজীবন পেনশন পাবেন।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধা পান না, তাদের ‘প্রগতি’ স্কিমের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাসীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিদেশ যাওয়ার আগে কর্মীদের ‘প্রবাস’ স্কিম সম্পর্কে জানানো এবং বিমানবন্দরে নিবন্ধনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে নিবন্ধনে দেওয়া প্রণোদনা ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করা হয়েছে।
এ ছাড়া পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করা, পেনশন তহবিল থেকে ঋণের সুযোগ এবং স্বাস্থ্যবিমা যুক্ত করার বিষয়ও পর্যালোচনা করছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা; জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ; এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি); বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক