ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান বন্ধ নয়, নিয়ন্ত্রণে আনাই টেকসই পরিবহনের পথ

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৬ দুপুর
  • ৬৭৩৮ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান এখন গণপরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় ৪০ থেকে ৬০ লাখ এমন যান প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াতে, বিশেষ করে প্রথম ও শেষ মাইলের সংযোগে ভূমিকা রাখছে। তবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলাচলের কারণে এসব যান একই সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় নিষিদ্ধ করার বদলে নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, নির্দিষ্ট রুট ও কারিগরি মানদণ্ডের আওতায় এনে এসব যানকে গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে।

২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ২১ শতাংশের জন্য ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান দায়ী ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ১ হাজার ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনা করেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বৈদ্যুতিক বাসের পাশাপাশি প্রথম ও শেষ মাইলের যাতায়াত নিশ্চিত করতে তিন চাকার যানগুলোকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় আনা জরুরি।

নিষিদ্ধ নয়, প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা

ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মত দিয়েছেন পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়ন নীতি বিশ্লেষক তৌফিক মহিউদ্দীন। তাঁর মতে, এসব যান বন্ধের উদ্যোগ নিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় একটি বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব যানের প্রায় ৯০ শতাংশ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ এ খাতে বিনিয়োগ করেছেন। ফলে নিয়ন্ত্রণের অর্থ নিষিদ্ধ করা নয়; বরং গুণগত মানদণ্ড, নির্দিষ্ট গতিসীমা, নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করা।

বুয়েটের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আসিফ-উজ-জামান খানের প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব যানকে প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে মেট্রোরেল ও বাসস্টেশনের আশপাশে ফিডার সার্ভিস হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে গণপরিবহনের বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে সংযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

নীতিমালা আছে, বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘থ্রি-হুইলড লো-স্পিড ব্যাটারি-অপারেটেড রিকশা (ই-রিকশা) ইন সিটি কর্পোরেশন এরিয়া রুলস, ২০২৫’ জারি করেছে। তবে নীতিমালা বাস্তবায়নই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান চলাচল করছে। বিপরীতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত ইলেকট্রিক যানের সংখ্যা মাত্র ৬৬৯। নিবন্ধিত যান ও বাস্তবে চলাচলকারী যানের এই বিশাল ব্যবধানকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সীসা ব্যাটারি নিয়ে পরিবেশগত উদ্বেগ

ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবেশগত উদ্বেগ সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এসব যান দেশের মোট সীসা ব্যাটারি বাজারের ৭৮ শতাংশ ব্যবহার করছে।

সিপিডির গবেষণার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রায় ৮০ শতাংশ সীসা ব্যাটারি অবৈধভাবে পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ শিশুর সীসা বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাটারিচালিত যান বায়ুদূষণ কিছুটা কমাতে সহায়ক হলেও ব্যাটারি বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে পরিবেশগত সুফল সীমিত হয়ে পড়তে পারে।

চালকদের সুরক্ষায় নিবন্ধনের গুরুত্ব

ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান নিয়ন্ত্রণ করলে স্বল্প আয়ের চালকদের জীবিকা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—এমন সমালোচনাও রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়ন্ত্রণ আর নিষিদ্ধকরণ এক বিষয় নয়।

নিবন্ধনের আওতায় আনা হলে চালকরা বৈধ পরিচয় পেতে পারেন। দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা, বীমা সুবিধা এবং নির্ধারিত রুটে চলাচলের সুযোগও তৈরি হতে পারে। বিপরীতে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবস্থা চালু থাকলে দুর্ঘটনা ও চালকদের শোষণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

পাঁচ দফা নীতির প্রস্তাব

ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানকে টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ করতে পাঁচটি নীতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রথমত, বিআরটিএর অধীনে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানের জন্য পৃথক শ্রেণি চালু করতে হবে। এতে যানবাহনের ন্যূনতম কাঠামোগত মান, ব্রেকিং ব্যবস্থা এবং ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫ কিলোমিটার গতিসীমা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি থেকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে রূপান্তরের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাটারি উৎপাদক ও আমদানিকারকদের জন্য সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়িত্ব বা ইপিআর নীতি চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তৃতীয়ত, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে এসব যান চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করতে হবে। এসব রুট মেট্রোরেল ও বাসস্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে, তবে প্রধান সড়ক এড়িয়ে চলবে।

চতুর্থত, ব্যাটারি চার্জিং স্টেশন স্থাপনে ইউটিলিটি সার্ভিস চার্জে বিশেষ শুল্কহার চালুর প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে অনুমোদিত ৩২টি চার্জিং স্টেশনের সংখ্যা বাড়িয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি জেলায় অন্তত দুটি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

পঞ্চমত, চালকদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালুর কথা বলা হয়েছে। এতে নিরাপদ গাড়ি চালানো, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি সেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

বড় গণপরিবহন পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় জরুরি

দেশে ১ হাজার ৪০০ বৈদ্যুতিক বাস চালুর পরিকল্পনার পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানকে পরিবহন পরিকল্পনার বাইরে রাখলে সামগ্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থায় প্রথম ও শেষ মাইলের সংযোগ দুর্বল থেকে যেতে পারে।

তাই এসব যানকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট, নিরাপত্তা মানদণ্ড, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও চালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ, বৈধতা ও নিরাপত্তা—এই তিন ভিত্তির ওপর ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যানকে যুক্ত করা গেলে টেকসই গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে এর সমন্বয় সম্ভব বলে মত দিয়েছেন লেখক।

তথ্যসূত্র: স্টার নিউজে প্রকাশিত তৌফিক মহিউদ্দীনের মতামতধর্মী নিবন্ধ; বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিপিডির উদ্ধৃত তথ্য।
লেখক: তৌফিক মহিউদ্দীন, পরিকল্পনাবিদ ও উন্নয়ন নীতি বিশ্লেষক।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad