মায়েরা শুধু পরিবারের অভিভাবক নন, শান্তির নির্মাতাও

  • প্রথম দর্পণ,আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ দুপুর
  • ২৯২৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg ছবি: সংগৃহীত।
পরিবারের বিরোধ মেটানো থেকে শুরু করে সামাজিক সংঘাত প্রশমনে বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে মায়েরা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। তবে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাঁদের এই অবদান আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছে তুলনামূলকভাবে কম। ফিলিপাইনের তালান্দিগ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, পরিবার ও সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যকার বিরোধ নিরসনেও মায়েরা সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। দক্ষিণ এশিয়ার সমাজগুলোর জন্যও এ অভিজ্ঞতা নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।

ভারতের সমাজবিজ্ঞানী ড. সুধাংশুবালা সাহুর সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ফিলিপাইনের বুকিদনন প্রদেশের তালান্দিগ জনগোষ্ঠীর শান্তি প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর মতে, তালান্দিগ সমাজে মায়েদের শুধু সন্তান লালন-পালনকারী হিসেবে দেখা হয় না; পরিবার বা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে তা প্রশমনের ক্ষেত্রেও তাঁরা ভূমিকা রাখেন।

তালান্দিগ জনগোষ্ঠীর এক প্রবীণ নারী ওই বিশ্লেষণে বলেছেন, তাঁরা সবাই মা এবং তাই শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী।

বিরোধ নয়, সম্পর্ক রক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি

তালান্দিগ সমাজের এই ধারণার কেন্দ্রে রয়েছে একটি নৈতিক বোধ—বিরোধে জড়িত প্রত্যেকেই কারও না কারও সন্তান। ফলে সংঘাতকে শুধু জয়-পরাজয়ের বিষয় হিসেবে না দেখে সম্পর্ক রক্ষার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে বিরোধ নিষ্পত্তি শুধু আইনি বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মানবিক সম্পর্ক ও সামাজিক সংহতি রক্ষার দায়িত্ব হিসেবেও বিবেচিত হয়।

ভারতীয় সমাজেও নারীদের এমন ভূমিকার বিভিন্ন নজির রয়েছে। বিশ্লেষণে জিজাবাই ও বিদ্যাবতীর মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের নারী স্বনির্ভর গোষ্ঠী, স্থানীয় নারী সংগঠন এবং মণিপুরের মেইরা পাইবি আন্দোলনের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

সংঘাত মোকাবিলায় নারীদের অংশগ্রহণ

মণিপুরের মেইরা পাইবি বা ‘নারী মশালবাহক’ আন্দোলন এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে এই নারীরা সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান, সম্প্রদায়ের সুরক্ষা এবং জবাবদিহির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছেন। এতে দেখা যায়, মায়ের সামাজিক ভূমিকা কখনো কখনো পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর সামাজিক পরিসরেও বিস্তৃত হতে পারে।

তবে মাতৃত্ব নিজেই কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংঘাত-নিরসনকারী করে তোলে না। শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকার জন্য সামাজিক আস্থা, যোগাযোগের সুযোগ, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর প্রয়োজন। তাই বিষয়টিকে শুধু ‘মায়ের নৈতিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখলে এর প্রাতিষ্ঠানিক দিকটি উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

স্থানীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবার ও সম্প্রদায়ভিত্তিক অনেক বিরোধ স্থানীয় পর্যায়েই সৃষ্টি ও সমাধান হয়। এসব ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ অনেক সময় আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে ঘটে।

পারিবারিক মধ্যস্থতা, প্রতিবেশী বিরোধ মীমাংসা, নারী সমিতি, স্বনির্ভর গোষ্ঠী এবং স্থানীয় সামাজিক উদ্যোগ—এসব কার্যক্রমকে শান্তি প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

শান্তি প্রতিষ্ঠাকে শুধু রাষ্ট্রীয় চুক্তি, কূটনৈতিক আলোচনা কিংবা রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সামাজিক সম্পর্ক রক্ষার ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে মায়েদের ভূমিকার গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব। কারণ সংঘাতের প্রথম অভিঘাত প্রায়ই পরিবারে পড়ে এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরিবার ও পরবর্তী প্রজন্মকেও বহন করতে হয়।

এ ক্ষেত্রে ‘মা’ যত্ন, সহমর্মিতা, দায়িত্ব ও সম্পর্ক রক্ষার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হতে পারেন। তবে এই প্রতীকী ভূমিকাকে বাস্তব সামাজিক শক্তিতে রূপ দিতে নারীদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় নেতৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

ফিলিপাইনের তালান্দিগ জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা এবং ভারতের বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের উদাহরণ শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীদের অংশগ্রহণের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। পরিবার ও সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন সম্পর্ক রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা নারীদের অভিজ্ঞতা শান্তি ও সংঘাত-নিরসনের নীতিনির্ধারণে কতটা স্থান পাচ্ছে—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।

তথ্যসূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
Sidebar Ad