এর মধ্যেই গোদাগাড়ীতে এক ডিলারের গুদাম থেকে ৮১৭ বস্তা সার উদ্ধারের ঘটনায় প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে—সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত ও চাহিদার চেয়ে বেশি বরাদ্দ থাকার পরও কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না কেন?
পুঠিয়ায় মহাসড়ক অবরোধসম্প্রতি সারের দাবিতে পুঠিয়ায় মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিলারের দোকানে প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না। ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকে সার না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
ঝলমলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল আওয়াল বলেন, তিন দিন ধরে বাজারে ঘুরেও ডিলারের কাছ থেকে সার পাননি। অথচ বেশি টাকা দিলে খুচরা বাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষক নরেন কর্মকার বলেন, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও সার পাননি। এখন ধানের জমিতে সার না দিলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার প্রশ্ন, গুদামে সার থাকলে তা কৃষকের কাছে আসে না কেন?
আরেক কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, সকাল ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সকাল ১০টার দিকে জানানো হয়, সার শেষ। তার প্রশ্ন, সরকারি বরাদ্দের সার কোথায় যাচ্ছে?
গুদামে মজুত কয়েকগুণ বেশিনগরীর নওদাপাড়া এলাকায় বিএডিসির সার গুদাম পরিদর্শন শেষে মঙ্গলবার বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী জানিয়েছেন, রাজশাহীতে সারের কোনো সংকট নেই।
তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বিসিআইসির বাফার গুদামে ৯ হাজার ৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি ও ৮৫ টন ডিএপি মজুত রয়েছে। অন্যদিকে বিএডিসির গুদামে রয়েছে ৬ হাজার ৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি ও ৪ হাজার ৩৪৮ টন ডিএপি।
বিভাগীয় কমিশনার জানান, চলতি মাসে রাজশাহী জেলায় টিএসপির বরাদ্দ ১ হাজার ৪৫ টন। এর বিপরীতে শুধু বিএডিসির গুদামেই রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ টন। ইউরিয়ার মাসিক বরাদ্দ ৫ হাজার ৭০০ টন, অথচ বিসিআইসি বাফার গুদামেই রয়েছে প্রায় ১০ হাজার টন।
তিনি বলেন, সারের কোনো ক্রাইসিস নেই। গুদামে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিত ডিলারদের কাছে সার সরবরাহ করা হচ্ছে এবং ডিলাররা তা দোকানে বিক্রি করছেন।
ডিলারের গুদামেই ৮১৭ বস্তাসরকারি গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার দাবির মধ্যেই গোদাগাড়ীতে এক ডিলারের গুদাম থেকে ৮১৭ বস্তা সার উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত দুই দফা অভিযান চালিয়ে মেসার্স কৃষি ঘর নামের সার ডিলারের গুদাম থেকে ৬১৬ বস্তা এমওপি ও ২০১ বস্তা টিএসপি উদ্ধার করা হয়। অবৈধভাবে সার মজুতের অভিযোগে ডিলার সোলাইমান পাটোয়ারীকে এক মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোলাইমান বিসিআইসি ও বিএডিসির সার ডিলার। সার মজুত ও বিক্রির বিষয়ে গত দুই মাসে তাকে তিনবার সতর্ক করা হয়েছিল। এরপরও নিয়ম না মেনে বিপুল পরিমাণ সার গুদামে মজুত রাখায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইসরাত জাহান বলেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে ডিলারদের গুদাম ও বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান ও তদারকি চলছে। কেউ অবৈধভাবে সার মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি বা কৃষকদের হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরাদ্দের সার যাচ্ছে কোথায়?কৃষকদের অভিযোগ, অনেক সময় ডিলারের দোকানে সার না থাকলেও একই এলাকার অন্য দোকানে বাড়তি দামে সার পাওয়া যায়। ফলে সরকারি বরাদ্দের সার কীভাবে খুচরা বাজারে যাচ্ছে, সেটিও তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি গুদামে কত টন সার রয়েছে, সেই হিসাব দিয়ে বাজার পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। গুদাম থেকে ডিলার এবং ডিলার থেকে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
রাজশাহীর বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি হিসাব ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। একদিকে গুদামে চাহিদার চেয়ে কয়েকগুণ সার মজুত থাকার কথা জানাচ্ছে প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ, অন্যদিকে প্রয়োজনের সময়ে সার না পেয়ে কৃষককে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে, এমনকি রাস্তায়ও নামতে হচ্ছে।
তাই শুধু গুদামে কত সার রয়েছে, সেই হিসাব প্রকাশ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। কোন ডিলার কত সার বরাদ্দ পেয়েছেন, কতটা উত্তোলন ও বিক্রি করেছেন, কার কাছে বিক্রি করেছেন এবং বর্তমানে তার গুদামে কত সার রয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ ও নিয়মিত যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
একই সঙ্গে যেসব এলাকায় কৃষক সড়ক অবরোধ করেছেন, সেসব এলাকার বরাদ্দ, ডিলারদের সার উত্তোলন ও বিক্রির হিসাব এবং কৃষকের প্রকৃত চাহিদা মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, সারের প্রকৃত সংকট গুদামের মজুত দিয়ে নয়; প্রয়োজনের সময়ে কৃষকের হাতে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিই পরিস্থিতির আসল চিত্র তুলে ধরবে।
এখন রাজশিয়ার কৃষকদের মূল প্রশ্ন একটাই—গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার পরও সেই সার যাচ্ছে কোথায়?

মোঃ রায়হান চৌধুরী,(নিজস্ব প্রতিবেদক)