ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণই ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৭২ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ করা অনেক ঋণ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেই সুযোগ বন্ধ হওয়ায় প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে শুরু করেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামি ধারার কয়েকটি ব্যাংকে অনিয়ম ও বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের প্রভাব এখন স্পষ্ট হচ্ছে।
তাদের মতে, সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে। এর একটি বড় অংশ বিদেশে পাচার হওয়ায় সেই অর্থ ব্যাংকে ফেরত আসছে না। ফলে সংশ্লিষ্ট ঋণের বড় অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
ইসলামী ব্যাংকেই খেলাপি প্রায় ৯৯ হাজার কোটিপরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে। ব্যাংকটির মোট ঋণ ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ বের করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ ২০ খেলাপি ঋণগ্রহীতার মধ্যে ১৫টি প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এসব প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের ৬২ শতাংশ।
ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জামাল উদ্দিন মজুমদার বলেন, ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধ সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করতে না পারায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে এক বা একাধিক কিস্তি পরিশোধ না হলে নিয়মানুযায়ী ঋণ শ্রেণিকৃত করা হচ্ছে।
দ্বিতীয় জনতা, তৃতীয় ফার্স্ট সিকিউরিটিখেলাপি ঋণের পরিমাণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ঋণ ১ লাখ ৯০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭৫ শতাংশ।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেক্সিমকো, এস আলম, অ্যানটেক্স, ক্রিসেন্ট ও থার্মেক্স গ্রুপের ঋণসংক্রান্ত নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংকটি চাপে পড়ে। জনতা ব্যাংকে বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের মোট ঋণ ৬২ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৭ দশমিক ০৮ শতাংশ। ব্যাংকটি একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এরপর এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণ ৫৩ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের হার ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
শীর্ষ ১০ ব্যাংকের চিত্রঅগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৭৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। ব্যাংকটিও একসময় এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
আইএফআইসি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার ৫২০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৬৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের হাতে। বিভিন্ন বেনামি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বের করে নেওয়া হয়।
ন্যাশনাল ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৮ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৬৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ সিকদার পরিবারের হাতে চলে যায়। এরপর থেকেই ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থা দুর্বল হতে থাকে।
ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। আর শীর্ষ ১০-এর দশম ব্যাংক এবি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৫৬ শতাংশ।
সুবিধা দিয়েও কমছে না খেলাপিঋণখেলাপিদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার পরও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমছে না। বরং গত জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ আরও প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।
গত দুই বছরে খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তি, মামলা করে অর্থ আদায় এবং সমস্যাগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে স্বল্পসুদে অর্থায়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও খেলাপি ঋণ কমেনি, বরং বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ না করে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করার সময়সীমা শিথিল করতে চাইছে। আবার ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে নীতিগত ছাড় দেওয়া হয়েছে। অতীতেও এ ধরনের সুবিধা দেওয়া হলেও খেলাপি ঋণ কমেনি, বরং বেড়েছে।
তার মতে, ব্যাংক খাতকে আরও সংকটে ফেলে এমন কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া উচিত নয়। উন্নতি করা সম্ভব না হলেও অন্তত ‘ডু নো হার্ম’ নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
জাহিদ হোসেন বলেন, একই ঋণগ্রহীতা ও খেলাপিদের বারবার ছাড় দেওয়ায় বাজারে ভুল বার্তা গেছে। এতে অযোগ্য ঋণগ্রহীতারা প্রশ্রয় পাচ্ছেন। কর্মসংস্থান রক্ষার যুক্তিতে ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে অযোগ্য ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন না করে যাদের কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে, তাদের সরাসরি সহায়তা দেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের নীতির কারণে বড় ঋণখেলাপিরা মনে করতে পারেন, ঋণ পরিশোধ না করলেও ভবিষ্যতে আবার ছাড় পাওয়া যাবে। একইভাবে ব্যাংকগুলোও ধরে নিতে পারে, তারল্য বা মূলধন সংকটে পড়লেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি সহায়তা দিয়ে তাদের রক্ষা করবে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক