বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিনিয়োগ করে গত অর্থবছরে তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আয় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন বৈদেশিক আর্থিক সম্পদ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ আয় হয়েছে ১২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ খাত থেকেও উল্লেখযোগ্য আয় হওয়ায় গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট মুনাফা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রায় থাকা বিভিন্ন আর্থিক সম্পদ থেকে গত অর্থবছরে মোট সুদ আয় হয়েছে ১২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক বন্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি নোটে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ৫ হাজার ৬১১ কোটি টাকা।
এ ছাড়া বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংকে দেওয়া ঋণ থেকে ২ হাজার ৮৫৬ কোটি এবং স্বল্পমেয়াদি আমানত থেকে ২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকা সুদ আয় হয়েছে। অন্যান্য বৈদেশিক সম্পদ থেকে এসেছে আরও প্রায় ৮৭১ কোটি টাকা।
এর আগে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার আর্থিক সম্পদ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট আয় ছিল ৭ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সুদ আয় ছিল প্রায় ৭ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে এ খাত থেকে মোট আয় হয়েছিল ৬ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি বন্ড, সিকিউরিটিজ ও আমানতে বিনিয়োগ করে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক বাজারে কুপন রেট ও সুদের হার তুলনামূলক বেশি থাকায় এসব বিনিয়োগ থেকে আয় বেড়েছে।
অভ্যন্তরীণ খাতেও আয় ২২ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকারিজার্ভ বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকার ও দেশের ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা দিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক আয় করে। গত দুই বছর দেশে উচ্চ সুদহার থাকায় সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ ধার করেছে। একই সঙ্গে তারল্যসংকটে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ নিয়েছে।
এ কারণে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের আয় হয়েছে ২২ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। তবে আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় ছিল আরও বেশি—২৪ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা।
অভ্যন্তরীণ আয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি এসেছে সুদ থেকে। ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আয় করেছে ২১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। এ ছাড়া কমিশন ও ডিসকাউন্ট থেকে ৪৩১ কোটি, লভ্যাংশ বাবদ ২০০ কোটি এবং অন্যান্য খাত থেকে ৪৭৫ কোটি টাকা আয় হয়েছে।
নিট মুনাফা বেড়ে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটিসব মিলিয়ে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট পরিচালন আয় বা মোট মুনাফা হয়েছে ৩৫ হাজার ১৬ কোটি টাকা। বিভিন্ন খরচ বাদ দেওয়ার পর নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।
২০২৪–২৫ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মোট মুনাফা ছিল ৩৪ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ২২ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। আর ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মোট মুনাফা হয়েছিল ৪০ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা; নিট মুনাফা ছিল ১৫ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
গত অর্থবছরের নিট মুনাফার পুরো ২৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা সরকারকে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে ১০ হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়। পরে বাকি ১৫ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। একই অর্থবছরে পরিচালনাসহ বিভিন্ন কাজে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা।
উচ্চ সুদহারে বেড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয়বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রায় দুই বছর ধরে নীতিসুদহার ১০ শতাংশে রাখা হয়েছিল। গত অর্থবছরের পুরো সময়ও এই হার বহাল ছিল। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে অর্থ ধার করতে হয়েছে। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদ আয় বেড়েছে।
অর্থনীতিতে মন্দাভাব থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম সক্রিয় ছিল। ব্যাংক খাতে তারল্যসংকটের কারণে বিভিন্ন ব্যাংক আগের তুলনায় বেশি অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করেছে। এর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থ বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ থেকে ভালো রিটার্ন পাওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামগ্রিক আয় বেড়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ রয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। আর গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।
‘মুনাফা নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা’অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্য মুনাফা অর্জন নয়। ব্যাংক খাতের তদারকি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব।
তাদের মতে, দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতে বিদ্যমান সংকটের কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ কার্যক্রম বেড়েছে এবং এর ফলে সুদ আয়ও বেড়েছে। একইভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক উচ্চ সুদহারের সুবিধা পেয়েছে রিজার্ভ বিনিয়োগ।
তবে মুনাফা বৃদ্ধির বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, আয় বাড়াতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেন তার মূল দায়িত্ব ও নীতিগত লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নজরদারিতে রাখতে হবে।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক