এক দশকে বিদেশি ঋণ বেড়েছে তিন গুণ, বকেয়া ১৪ লাখ কোটি টাকা

  • প্রথম দর্পণ,ডেস্ক
  • আপলোড সময় : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩০ দুপুর
  • ৮৮৭৬ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
কিস্তি ও সুদ পরিশোধে বাড়ছে চাপ | সামনে রূপপুর ও তৃতীয় টার্মিনালের ঋণ পরিশোধের দায়

এক দশকে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০১৫ সালে দেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৮৭৭ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৩৪৩ কোটি ডলারে। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি ডলার ১২৫ টাকা হিসাবে দেশীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১৪ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা।

ঋণের এই ক্রমবর্ধমান বোঝার পাশাপাশি বাড়ছে আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ। আগামী দিনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হলে সরকারের আর্থিক দায় আরও বাড়তে পারে।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল ডেট রিপোর্ট-২০২৬’-এ বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে দেশের মোট বিদেশি ঋণের স্থিতি বেড়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। গত ৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

বহুপক্ষীয় সংস্থার কাছে ঋণ সবচেয়ে বেশি

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ এসেছে বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে বাংলাদেশের মোট বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ১১৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের কাছে ২ হাজার ২৬৩ কোটি এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ডলার বকেয়া রয়েছে।

অন্যদিকে জাপান, চীন, ভারত ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশের কাছে বাংলাদেশের ঋণ ৩ হাজার ২৬৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে জাপানের কাছে ১ হাজার ২৭২ কোটি এবং রাশিয়ার কাছে ৯০২ কোটি ডলার বকেয়া রয়েছে।

সরকারি ঋণের বাইরে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার কোটি ডলার। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।

ঋণ পরিশোধের সক্ষমতায় মিশ্র চিত্র

বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়লেও তা পরিশোধের সক্ষমতার কয়েকটি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে সহনীয় বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) তুলনায় বিদেশি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ২৪ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এ হার বেড়েছে প্রায় ৬ শতাংশ।

তবে রপ্তানি আয়ের বিপরীতে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধের অনুপাত কমে ১৬ শতাংশে নেমেছে। আগের বছরের তুলনায় এ হার কমেছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানি থেকে অর্জিত প্রতি ১০০ ডলারের মধ্যে ১৬ ডলার ব্যয় হচ্ছে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে।

এই অনুপাত কমে আসাকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে ঋণের মোট স্থিতি ও পরিশোধের পরিমাণ বাড়তে থাকায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা প্রয়োজন।

১৪ বছরে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে চার গুণের বেশি

বৈদেশিক ঋণের স্থিতির পাশাপাশি আসল ও সুদ পরিশোধের পরিমাণও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়েছিল ১১০ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০১ কোটি ডলারে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে পরিশোধের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০০ কোটি ডলার।

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলার। অর্থাৎ ১৪ বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে চার গুণেরও বেশি।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ১৩৫ কোটি ১২ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১২৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলার। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

সামনে বাড়তে পারে সরকারের দায়

বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় আগামী দিনে বৈদেশিক ঋণের চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শিগগির শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে মেট্রোরেল ও কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এসব প্রকল্পের ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় বাড়লে বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে বৈদেশিক ঋণের ক্রমবর্ধমান স্থিতি, সুদ ও আসল পরিশোধের দায় এবং বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের সময়সূচি আগামী দিনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad