বাইন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরি, ঝুঁকি যাচাইয়ে কঠোর হচ্ছে বীমা কোম্পানি

  • প্রথম দর্পণ অনলাইন,ডেক্স
  • আপলোড সময় : ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৪ দুপুর
  • ১০১৪৪ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
নতুন পলিসি ও নবায়নে বাড়তি নজরদারি | রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সাইবার হামলায় ক্ষতিপূরণ নিয়ে শঙ্কা

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরির ঘটনায় ক্রিপ্টো খাতের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছে বীমা কোম্পানিগুলো। এ ঘটনার পর ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোরভাবে যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে তারা। নতুন বীমা পলিসি গ্রহণ কিংবা বিদ্যমান পলিসি নবায়নের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।

গত ২৯ অক্টোবর বাইন্যান্সে এই বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ক্রিপ্টো খাতের বীমা সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা নতুন করে সামনে এসেছে। একই সঙ্গে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারে উদ্যোগী হয়েছে ক্রিপ্টো লেনদেন প্ল্যাটফর্মগুলো। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা কোম্পানিগুলো এখন থেকে নতুন বীমা প্রদান বা পলিসি নবায়নের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাইন্যান্সের ব্যবসায়িক সম্পর্ক, সেখানে রাখা অর্থের পরিমাণ এবং সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা খতিয়ে দেখবে। তবে এ কারণে বীমা কোম্পানিগুলো ক্রিপ্টো খাত থেকে পুরোপুরি সরে যাবে কিংবা বীমা সুবিধা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেবে, এমন আশঙ্কা এখনই দেখা যাচ্ছে না। বরং ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আরও কঠোর হবে তারা।

নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাড়তি যাচাই

গ্যালাঘারের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড রজার্স বলেন, বীমা কোম্পানিগুলো এখন বাইন্যান্সকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্ন করবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো—বাইন্যান্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক কী এবং সেখানে তাদের কোনো অর্থ জমা রয়েছে কি না।

তার মতে, হামলার তদন্তে নিরাপত্তার যেসব দুর্বলতা সামনে আসবে, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে বীমা কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

বাইন্যান্সের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, হ্যাকাররা ভুয়া চাকরির সাক্ষাৎকার এবং বিজ্ঞাপনের আড়ালে ক্ষতিকর সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটির দুই সফটওয়্যার প্রকৌশলীর কম্পিউটারে প্রবেশ করে। পরে তৃতীয় একটি কম্পিউটার ব্যবহার করে ৬৩০ কোটি ডলার মূল্যের ক্রিপ্টো সম্পদ হাতিয়ে নেয় তারা।

বাইন্যান্স জানিয়েছে, পুরো হামলাটি ছিল বহুস্তরবিশিষ্ট। জুন মাসে শুরু হওয়া ধারাবাহিক নিরাপত্তা লঙ্ঘনের পরিণতিতে এই বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটে।

নবায়নের সময় বাড়বে শর্ত

বীমা খাতের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ঘটনার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে না পড়লেও পরবর্তী পলিসি নবায়নের সময় তা স্পষ্ট হতে পারে। সাধারণত এক বছরের জন্য বীমা পলিসি কার্যকর থাকে। ফলে নবায়নের আগে বীমা কোম্পানিগুলো নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন, হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত নিরাপত্তা শর্ত আরোপ করতে পারবে।

মার্শের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান জ্যাকলিন কুইন্টাল বলেন, বীমার সক্ষমতা, মূল্য নির্ধারণ কিংবা কভারেজে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে ভবিষ্যতে একই ধরনের সাইবার হামলার ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা গ্রাহকদের কাছে জানতে চাইতে পারে বীমা কোম্পানিগুলো।

তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান বীমা নবায়ন বা নতুন পলিসি গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যেই একই ধরনের সাইবার হামলার শিকার হোক, তা কেউই চাইবে না।

বীমা কোম্পানিগুলোর এই যাচাই কেবল সাধারণ সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বাইন্যান্সের ঘটনায় তদন্তে উঠে আসা নির্দিষ্ট দুর্বলতাগুলোও গুরুত্ব পাবে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থায় একই ধরনের ত্রুটি রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে চাইবে বীমা প্রদানকারীরা।

লন্ডনভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠান রিড স্মিথের বীমাবিষয়ক আইনজীবী পিটার হার্ডি বলেন, বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থায় তদন্তের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট দুর্বলতা শনাক্ত হলে অন্য বীমাগ্রহীতাদের ক্ষেত্রেও সেই ত্রুটি দূর করার শর্ত আরোপ করতে পারে বীমা কোম্পানিগুলো।

উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে জটিলতা

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) শুরু থেকেই এই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে দায়ী করে আসছে।

মার্কিন ও দক্ষিণ কোরীয় কর্তৃপক্ষ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সাইবার ইউনিট ব্যবহার করে গুপ্তচরবৃত্তি ও অর্থ চুরির কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। তবে পিয়ংইয়ং এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

মর্নিংস্টার ডিবিআরএসের গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন রেটিং বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মার্কোস আলভারেজ বলেন, এই হামলায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে বীমা দাবি নিষ্পত্তি জটিল হয়ে উঠতে পারে।

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে লয়েডসের সাইবার বীমা পলিসিগুলোতে সাধারণত রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট সাইবার হামলাকে বীমা সুরক্ষার বাইরে রাখার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া বাইন্যান্সের ক্ষতির পরিমাণ বর্তমান বাজারে প্রচলিত যেকোনো বীমা পলিসির সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ সীমার চেয়েও বেশি।

মার্কোস আলভারেজ বলেন, কোনো হামলা রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত বলে বিবেচিত হলে বীমা কোম্পানিগুলো ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে আপত্তি তুলতে পারে। ভূরাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট বড় ধরনের সাইবার ক্ষতির ক্ষেত্রে এ ধরনের বীমা শর্ত কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়।

বাড়ছে ক্রিপ্টো বীমার বাজার

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাইন্যান্সের ঘটনা দ্রুত সম্প্রসারণশীল ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পের বীমা সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে। আড়াই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের এই খাতে বড় ধরনের সাইবার হামলার ক্ষতি পূরণের মতো পর্যাপ্ত বীমা সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট হামলার ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে ক্রিপ্টো বীমার বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টো বীমা বাজারের আকার ২০২৬ সালের ১৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০৩৩ সালে ১৯২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বাইন্যান্সে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা তাই শুধু ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্মগুলোর নিরাপত্তা নয়, এ খাতের বীমা ঝুঁকি নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad