৭ নভেম্বরের চেতনায় গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের

  • মো. জাকির হোসাইন,স্টাফ রিপোর্টার
  • আপলোড সময় : ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৮ রাত
  • ১৩৮২৫ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg
গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি, কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফেরার আশঙ্কা প্রকাশ

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের চেতনা ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা হচ্ছে অন্যায়-অবিচার, একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা। জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে কেউ দেশ পরিচালনা করলে ইতিহাস তাকে ক্ষমা করবে না।

শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের মনের ভাষা বুঝে দেশ পরিচালনা করতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম দায়িত্ব। অতীতের দুঃশাসন ও একদলীয় শাসনের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সুসংহত করতে হবে।

অতীতের শাসনব্যবস্থার সমালোচনা

১৯৭২ সালের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত আমির অভিযোগ করেন, তৎকালীন সরকার ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ, বিরোধী মত দমন এবং রক্ষীবাহিনীকে জবাবদিহির বাইরে রেখে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছিল। তার দাবি, রক্ষীবাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

তিনি বলেন, হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও দুর্নীতির বিচার না হওয়া এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করার মধ্য দিয়ে দেশে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহুদলীয় গণতন্ত্রের অবসান ঘটানো হয়।

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ধারাবাহিক রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা চলছিল। ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর বন্দি জিয়াউর রহমানকে ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহিরা মুক্ত করেন। সিপাহিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সংহতির মধ্য দিয়েই দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি পায়।

তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা অর্জনে যার যেখানে অবদান রয়েছে, তাকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। ইতিহাস নিয়ে কৃতিত্বের প্রতিযোগিতা না করে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দিতে হবে।

গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু সেই রায় বাস্তবায়ন না করে কর্তৃত্ববাদী শাসনে ফিরে যাওয়ার আয়োজন চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল। সংসদের প্রথম অধিবেশনে সেগুলো উত্থাপিত হলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। তার মতে, এসব অধ্যাদেশ বহাল থাকলে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ফিরে আসার পথ অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হতো।

সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোক নিয়োগ ও দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনসহ সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দায়িত্ব না দিলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া এবং অন্যান্য সদস্যকে চাপের মুখে বিদায় করার অভিযোগও তোলেন তিনি। তার ভাষ্য, মেধার ভিত্তিতে চাকরি ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাকে সম্মান জানানো হচ্ছে না। দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার মানসিকতা যুবসমাজের প্রতি অবিচার।

বিরোধী দলের অবস্থান ও সাত দফা দাবি

বিরোধী দলের দায়িত্ব প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ করতে তারা শুরু থেকেই সহযোগিতার মনোভাব দেখিয়েছেন। ন্যায়সংগত বিষয়ে সহযোগিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করাই বিরোধী দলের নীতি। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাতে তারা সাত দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এসব দাবি কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং জনগণের দাবি। সংবিধান সংস্কার, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ছাড়া জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়।

র‌্যাবের নাম পরিবর্তন করে নতুন কাঠামো গঠনের উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শুধু নাম পরিবর্তন করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন হলে আলোচনা করে নতুন বাহিনী গঠন করতে হবে এবং বর্তমান সদস্যদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয়; এটি একটি মানসিকতা। যে কেউ ক্ষমতায় গিয়ে এ মানসিকতায় আক্রান্ত হতে পারে। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের কোথাও ফ্যাসিবাদের লক্ষণ দেখা গেলে তার বিরুদ্ধে সবাইকে দাঁড়াতে হবে।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান জনগণের অর্জন

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই আন্দোলনের কৃতিত্ব জামায়াতে ইসলামী দাবি করেনি। তারা এটিকে দেশের জনগণের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিয়ামত হিসেবে বিবেচনা করে। আন্দোলনে শহীদদের পরিবার এবং আহত ও পঙ্গু ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে দলটি। এ ক্ষেত্রে কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচনা করা হয়নি।

তিনি বলেন, একদিকে কেউ গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করছেন, অন্যদিকে আবার আন্দোলনের নেতৃত্বের কৃতিত্ব দাবি করছেন। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য জাতির সঙ্গে উপহাসের শামিল।

সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে মাতারবাড়ীসহ জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার করতে হবে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও আধিপত্যবাদমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান

সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে শুধু সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে ছিল একদলীয় শাসন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনমনের ক্ষোভ। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নেরও আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগরী উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, বাজার সিন্ডিকেট, দলীয়করণ ও জনদুর্ভোগ অব্যাহত থাকলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লার সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসা, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাত।





কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad