মৃত্যুফাঁদ হাটিকুমরুল হেলথ কেয়ার হাসপাতাল: প্রসূতির প্রাণহানি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ

  • শাহিন রেজা,মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ
  • আপলোড সময় : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:৩২ দুপুর
  • ৫১২৩ বার পড়া হয়েছে

Banner Ad
https://www.prothomdorpan.com/admin/fav-icon-logo/image/1761146741.250..125.jpg হেলথ্ কেয়ার হাসপাতাল

চিকিৎসা সেবা নাকি মৃত্যুফাঁদ? সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল ‘হেলথ কেয়ার হাসপাতাল’ ঘিরে এই প্রশ্ন এখন গোটা জেলার সচেতন মহলের মুখে মুখে।

সেবার নামে চিকিৎসায় মারাত্মক অবহেলা, ভুয়া বা অনুপস্থিত চিকিৎসকের হাতে অপারেশন, দক্ষ জনবলের অভাব এবং লাইসেন্স-অনুমোদন সংক্রান্ত অনিয়ম যেন হাসপাতালটির নিত্যদিনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক প্রসূতির মৃত্যু ও রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠলেও রহস্যজনক কারণে অধরাই থেকে যাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

​সম্প্রতি সিরাজগঞ্জ হেলথ কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসায় প্রসূতি খাদিজা খাতুনের (৩০) করুণ মৃত্যুর ঘটনা পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। খাদিজাকে সিজারিয়ান অপারেশনের জন্য থিয়েটারে নেওয়ার পর অ্যানেসথেশিয়া ডা. হযরত আলীর ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ ও শারীরিক অবনতির কারণে রোগীর মৃত্যু হলেও তা স্বজনদের কাছে গোপন রাখা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

দীর্ঘ সময় জ্ঞান না ফেরার অজুহাত দেখিয়ে থিয়েটারে লাশ ফেলে রেখে প্রধান চিকিৎসক ডা. জেবুন্নেছা ও অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক তড়িঘড়ি করে পালিয়ে যান। পরে স্বজনরা অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে খাদিজার মরদেহ দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং হাসপাতালজুড়ে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

​ঘটনার পরপরই চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দ্বিমুখী বক্তব্যে জালিয়াতির নতুন রূপ উন্মোচিত হয়। অ্যানেসথেশিয়া চিকিৎসক ডা. হযরত আলী স্বীকার করেন যে অপারেশনের সময় ডা. জেবুন্নেছা উপস্থিত ছিলেন। অথচ ডা. জেবুন্নেছা পুরো দায় এড়িয়ে দাবি করেন তিনি নাকি সেই সময় ছুটিতে ছিলেন! সরকারি মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক পদে কর্মরত থেকে সরকারি নিয়মকানুন তোয়াক্কা না করে কীভাবে তিনি নিজ স্বামীর পরিচালনায় থাকা প্রাইভেট হাসপাতালে এমন ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম চালান, তা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে জনমনে।

​শুধু খাদিজার মৃত্যুই নয়, হেলথ কেয়ার হাসপাতালে প্রসূতি ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসায় অবহেলা এবং ভুল চিকিৎসার ঘটনা যেন নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি অপারেশন থিয়েটারে মূখ্য চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, প্রসূতি রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়া সত্ত্বেও উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে স্থানান্তরে বাধা দেওয়া এবং সুচিকিৎসা না দেওয়ার মতো মারাত্মক অনিয়মের ঘটনা ঘটে।

এসব অব্যবস্থাপনার প্রতিকার এবং হাসপাতালটির লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, ওটি ব্যবস্থাপনা ও ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে জেলা সিভিল সার্জন বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন সচেতন নাগরিক মো. সুলতান মাহমুদ।

​অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি দুর্ঘটনার পরই হাসপাতালটির পরিচালক এবং ডা. জেবুন্নেছার স্বামী ফিরোজ আহমেদ স্থানীয় প্রভাবশালী মহলকে ব্যবহার করে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টায় মেতে ওঠেন।

এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আপস-রফায় বাধ্য করার চেষ্টার অভিযোগও নিত্যদিনের। কোনো অপকর্ম বা মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে সাংবাদিকদের সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে হাসপাতাল পরিচালকের বিরুদ্ধে।

​সিরাজগঞ্জের সুশীল সমাজ ও নিহতের স্বজনদের দাবি—শুধু লোকদেখানো তদন্ত কমিটি গঠন নয়, খাদিজার মৃত্যসহ পূর্বের সকল অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্সহীন এই ‘মৃত্যুকূপ’ হেলথ কেয়ার হাসপাতালটি স্থায়ীভাবে সিলগালা করার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

​এখন দেখার বিষয়, সিরাজগঞ্জের স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসন প্রসূতি ও সাধারণ রোগীদের জীবন রক্ষায় কত দ্রুত এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। নাকি কোনো অদৃশ্য শক্তির ইশারায় পার পেয়ে যাবে হেলথ কেয়ার হাসপাতালের এই অপরাধ চক্র?




কমেন্ট করুন:

ফেসবুকে আমরা
সর্বশেষ সংবাদ
Sidebar Ad