দীর্ঘ ৩৫ বছরের বিরতি ভেঙে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ ও সংশয় বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। দ্রুত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন সদ্য সাবেক রাকসু নেতা, সাধারণ শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের জুলাইয়ে রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। প্রথমে সেপ্টেম্বরে ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও কয়েক দফা পরিবর্তনের পর ১৬ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। প্যানেলটির ২৪ দফা ইশতেহারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল রাকসু নির্বাচন নিয়মিত করতে ক্যালেন্ডারভুক্ত করা। তবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।
প্রশাসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় নির্বাচনরাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নির্বাচিত নির্বাহী কমিটির মেয়াদ দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর। মেয়াদ শেষ হলেও নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান।
তিনি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি সম্পূর্ণ উপাচার্যের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। উপাচার্য আগের নির্বাচনের পরিস্থিতি, দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলো নিয়ে তথ্যসহ একটি ফাইল চেয়েছিলেন। সে অনুযায়ী তিনি ফাইল জমা দিয়েছেন।
কোষাধ্যক্ষের ভাষ্য, শিক্ষার্থীরা নির্বাচন আয়োজনের জন্য চাপ দিচ্ছেন। বিষয়টি আলোচনায় রাখার অংশ হিসেবে হয়তো তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়ার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো নেই।
অন্যদিকে, রাকসুর সাবেক নেতাদের দাবি, পরবর্তী নির্বাচন আয়োজনের জন্য তারা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
রাকসুর সাবেক এজিএস সালমান সাব্বির বলেন, পরবর্তী রাকসু যাতে ধারাবাহিকভাবে চালু থাকে, সেটি তাদের ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল। এ লক্ষ্যে তৃতীয় অধিবেশন থেকেই উপাচার্যকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত অধিবেশনে উপাচার্য বর্তমান কোষাধ্যক্ষকে নির্বাচনের তফসিল প্রণয়ন ও গঠনতন্ত্র সংস্কারের দায়িত্ব দিয়েছেন। এ বিষয়ে দ্রুত হালনাগাদ তথ্য জানাতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কোষাধ্যক্ষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর পরবর্তী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তফসিল ও গঠনতন্ত্র সংস্কারের বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে। এ বিষয়ে তারা নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
রাকসুর সাবেক জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, রাকসু সচল রাখার প্রতিশ্রুতি তিনি শিক্ষার্থীদের দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
সাবেক ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে তারা বারবার প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, প্রশাসন অন্যান্য বিষয়ে মনোযোগ দিলেও রাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেনি। নির্বাচনের তিন মাস আগে প্রস্তুতি শুরুর কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীরা নির্বাচন চান—আগের নির্বাচনেই তা স্পষ্ট হয়েছে। এরপরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘ছাত্ররা চাইলে নির্বাচন হবে’ ধরনের বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে। এতে নির্বাচন না দেওয়ার পথ তৈরি করা হচ্ছে কি না, সে আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশ-পরিস্থিতির কথা বলছে প্রশাসনবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, রাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রশাসন ভাবছে। ছাত্র সংসদ থাকা এবং নির্বাচন হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রত্যাশা। তবে নির্বাচন আয়োজন শুধু সময়ের ওপর নির্ভর করে না; সামগ্রিক পরিবেশ ও পরিস্থিতিও অনুকূলে থাকতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
দ্রুত তফসিল চান ছাত্র সংগঠনের নেতারারাকসুর নির্বাচন ও কার্যক্রম ধারাবাহিক রাখার দাবি জানিয়েছেন ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা। তাঁদের মতে, শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে ছাত্র সংসদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক মেহেদী সজীব বলেন, রাকসু শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতেও এর ভূমিকা রয়েছে। তাই রাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনতিবিলম্বে পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা উচিত।
তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, যার কারণে নির্বাচন আয়োজন করলে পরিবেশ অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল মিঠু বলেন, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সহাবস্থান প্রয়োজন। ছাত্র সংসদ নির্বাচন সাধারণ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার অন্যতম মাধ্যম। রাকসুর এ ধারা অব্যাহত থাকা উচিত।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, এবারের রাকসু শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে ছাত্র সংসদের প্রয়োজন রয়েছে। আগামীতে শিক্ষার্থীরা সচেতনভাবে প্রতিনিধি নির্বাচন করলে এর মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ জন্য শিক্ষার্থীদের রাকসুর দাবিতে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

প্রথম দর্পণ,ডেস্ক